মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় শারদীয় দুর্গাপূজার ষষ্ঠী পালনের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। কাশফুল-শিউলিফুলের সুবাস আর ঢাকের ধ্বনিতে মুখরিত এই শরতের উদযাপন সনাতনী সম্প্রদায়ের সবচেয়ে প্রিয় উৎসব।
২৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে মূল আনুষ্ঠানিকতা, যা ২ অক্টোবর বিজয়া দশমী পর্যন্ত চলবে। এই উৎসবে অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়গান করা হয়, যা সমাজের সকল স্তরের মানুষকে একত্রিত করে। মৌলভীবাজার জেলায় মোট ১০৩৬টি মণ্ডপে পূজা হচ্ছে, যার মধ্যে রাজনগর উপজেলায়ও বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মণ্ডপ সজ্জিত হয়েছে।
এই উৎসবের মূলমন্ত্র হলো ‘শুভ শারদীয়া’ যা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং সমাজসেবারও একটি মাধ্যম। এই বছর রাজনগরের স্থানীয় সংগীত একাডেমি এই উৎসবে অসহায় সনাতনীদের পাশে দাঁড়িয়ে একটি উদাহরণ স্থাপন করেছে। রাজনগর সংগীত একাডেমির উদ্যোগে শতাধিক গরীব অসহায় মানুষের মধ্যে বস্ত্র এবং নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। অনাধী আদি মন্দিরে অনুষ্ঠিত এই বিতরণ কর্মসূচি রাজনগর সদর ইউনিয়নের গড়গাঁও এলাকায় সম্পন্ন হয়েছে। এটি না শুধু উৎসবের আনন্দ বাড়িয়েছে, বরং দীন-দরিদ্রদের মুখে হাসি ফোটিয়েছে।
বিতরণ অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন রাজনগর সদর ইউনিয়ন পূজা উদয়াপন পরিষদের সভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী প্রজেশ দেব। সঞ্চালনা করেন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক এবং মৌলভীবাজারের প্রখ্যাত সংগীত শিক্ষিকা ফারুল দেব। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন একাডেমির পরিচালক, পূজা উদয়াপন পরিষদ রাজনগর উপজেলার সাংস্কৃতিক সম্পাদক অচিন্ত দেব এবং একাডেমির অন্যতম সংগীতশিল্পী প্রতুল গাল প্রবাসী অনাদি দেব গৌতম। তারা সকলে আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, দুর্গাপূজা শুধু উদযাপন নয়, সমাজের প্রত্যেক সদস্যের প্রতি দায়বদ্ধতারও প্রতীক। ফারুল দেব বলেন, “এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা চাই, উৎসবের আলোয় কেউ অন্ধকারে না থাকে। সংগীতের মতোই এই সেবা আমাদের একাডেমির মূল লক্ষ্য।”
একশো জনেরও বেশি অসহায়-দরিদ্র মানুষ এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে অনেকেই বয়স্ক সনাতনী, যাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কষ্টের ছায়া। বিতরিত বস্ত্রগুলো নতুন শাড়ি এবং পোশাক, যা পূজার উপযোগী। নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল প্রত্যেকের জন্য যথেষ্ট, যাতে তারা উৎসব উপভোগ করতে পারেন। একজন গ্রহীতা বলেন, “এই সাহায্য আমাদের মায়ের পূজায় অংশ নেওয়ার সাহস দিয়েছে। দেবী দুর্গার আশীর্বাদ সকলের উপর থাকুক।”
রাজনগর সংগীত একাডেমি এই ধরনের উদ্যোগের জন্য পরিচিত। এটি স্থানীয়ভাবে সংগীত শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণে সক্রিয়। মৌলভীবাজারের মতো এলাকায়, যেখানে চা বাগানের শ্রমিক থেকে গ্রামীণ অসহায় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের মানুষ রয়েছে, এমন উদ্যোগগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় চা শ্রমিকদের মধ্যে শাড়ি বিতরণের ঘটনা ঘটেছে, যা এই অঞ্চলের সামাজিক সচেতনতার প্রমাণ। রাজনগরের এই কর্মসূচি সেই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয়েছে।
দুর্গাপূজার এই সময়ে সমাজের অভাবীদের পাশে দাঁড়ানো সত্যিই প্রশংসনীয়। এটি শুধু বিতরণ নয়, বরং সমাজের ঐক্যবদ্ধতার বার্তা দেয়। স্থানীয় প্রশাসনও এই উৎসব নিরাপদে সম্পন্ন করতে সহায়তা করছে। রাজনগরের মানুষ আশা করছে, এই উদ্যোগ আরও বড় আকার ধারণ করবে, যাতে উৎসবের আনন্দ সকলের কাছে পৌঁছায়। শুভ শারদীয়া দুর্গার জয়গান চিরকাল থাকুক।