নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে শীর্ষ সন্ত্রাসী শুটার মাসুদ বিদেশি পিস্তল, গুলি ও মাদকসহ আটক হয়েছেন। অন্যদিকে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় পুলিশ ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় জড়িত এবং দীর্ঘদিন ধরে মেঘনায় ত্রাস সৃষ্টি করা শীর্ষ নৌ-ডাকাত আক্তারকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-১১। তাদের কাছ থেকে বিদেশি অস্ত্র, মাদক, বিশেষ নৌকা ও ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই র্যাব দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, খুনি, ডাকাত, ছিনতাইকারী, অপহরণকারী, প্রতারক থেকে শুরু করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার—সবক্ষেত্রেই র্যাব সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। বিশেষ করে চাঞ্চল্যকর ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে তারা ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে।
র্যাব-১১ জানায়, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ অঞ্চলে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও নৌ-ডাকাতদের দমনে দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারি চলছিল। বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে পৃথক দুটি অভিযানে শুটার মাসুদ ও ডাকাত আক্তারকে আটক করতে সক্ষম হয় র্যাব সদস্যরা।
গত ২৭ জুলাই ২০২৪ সোনারগাঁও থানার নোয়াদ্দা বাবুবাজার এলাকায় কাপড় ব্যবসায়ী রাকিব (২৫) প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হন। ওই সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়। ফুটেজে দেখা যায়, গ্রেফতারকৃত মাসুদ ওরফে শুটার মাসুদ (২৮) ব্যবসায়ী রাকিবকে রাস্তায় ফেলে কোমর থেকে পিস্তল বের করে টানা দুটি গুলি চালান। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি অস্ত্র হাতে বীরদর্পে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
তদন্তে উঠে আসে, মাসুদ বাহিনী আড়াইহাজার ও সোনারগাঁও এলাকায় অস্ত্রের শোডাউন, চাঁদাবাজি, লুটপাট, ছিনতাই, মাদক বেচাকেনা ও সেবনে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিল। এতে এলাকায় সাধারণ মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় দিন কাটাত।
এরই ধারাবাহিকতায় ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সোনারগাঁও থানাধীন পেরাব এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে র্যাব-১১ সদস্যরা মাসুদকে আটক করে। এসময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, ছয় রাউন্ড তাজা গুলি, ৫৮ পিস ইয়াবা ও দুটি বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়।
র্যাব জানায়, শুটার মাসুদের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন থানায় মোট ৭টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হত্যা, তিনটি হত্যা চেষ্টা, একটি নাশকতা, একটি ডাকাতি ও একটি মাদক মামলা অন্তর্ভুক্ত। সম্প্রতি একই গ্রুপের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী শুটার রিয়াজকে সিলেটের গোয়াইনঘাট থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
অন্যদিকে গত ২৫ আগস্ট ২০২৫ বিকালে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া থানাধীন গুয়াগাছিয়া এলাকায় মেঘনা নদীতে পুলিশ অভিযানের সময় নয়ন-পিয়াস-আক্তার বাহিনীর নেতৃত্বে ডাকাতরা পুলিশ ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা চালায়। প্রায় ৪০-৫০ জন ডাকাত সদস্য চার-পাঁচটি দ্রুতগামী ট্রলারে এসে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ ও গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালালে ডাকাতরা পালিয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নয়ন, পিয়াস ও আক্তার বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা নদী ও শাখা নদীতে অবৈধ বালু ব্যবসা, নৌযান থেকে চাঁদাবাজি ও নৌ-ডাকাতির সঙ্গে জড়িত। তাদের তাণ্ডবে এলাকার শতাধিক পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। একাধিকবার গোলাগুলির ঘটনায় সাধারণ মানুষও নিহত হয়েছেন।
৭ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার তিতাস উপজেলার একটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে র্যাব-১১ আক্তার সরকারকে গ্রেফতার করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই রাতে দাউদকান্দি উপজেলার মোল্লাকান্দি এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ ক্যাম্পে হামলায় ব্যবহৃত বিশেষ ইঞ্জিনচালিত নৌকা, পাঁচটি পিতলের নৌকার পাখা, দুটি চুম্বক, একটি বাইনোকুলার, একটি ধারালো ছোরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
আক্তার সরকারের বিরুদ্ধে মোট ২৭টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি হত্যা, ১৪টি হত্যা চেষ্টা, দুটি ডাকাতি, একটি অপহরণ, একটি চাঁদাবাজি, চারটি বিস্ফোরক ও একটি মাদক মামলা অন্তর্ভুক্ত। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই নদীপথে ডাকাতির মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আসছিলেন।
র্যাব জানায়, এর আগেও ২৮ আগস্ট ও ৩ সেপ্টেম্বর বিশেষ অভিযানে এ হামলার সঙ্গে জড়িত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। ফলে পুরো নৌ-ডাকাত চক্রটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে চলে এসেছে।
শুটার মাসুদ ও ডাকাত আক্তারের গ্রেফতারের খবর এলাকায় স্বস্তি ফিরিয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাস ও ডাকাতির কারণে তারা চরম ভোগান্তিতে ছিলেন। বিশেষ করে নৌ-ডাকাতদের দৌরাত্ম্যে নদীপথে চলাচল ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।
র্যাব-১১ এর অধিনায়ক পদাতিক লে. কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন। তিনি বলেন, সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে র্যাব সর্বদা সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এ ধরনের অভিযান চলমান থাকবে।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের শীর্ষ সন্ত্রাসী শুটার মাসুদ ও মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার শীর্ষ নৌ-ডাকাত আক্তারের গ্রেফতার সাম্প্রতিক সময়ে অন্যতম বড় সাফল্য। এ অভিযানের মাধ্যমে র্যাব-১১ প্রমাণ করেছে, অপরাধীরা যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত আইনের আওতায় আসবেই। জনগণের নিরাপত্তা ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে র্যাবের এ ধরনের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী করবে।