বাংলাদেশ — ছোট্ট এই ভূখণ্ডের প্রতিটি জেলারই রয়েছে নিজস্ব চরিত্র, ঐতিহ্য, ও বিশেষ দক্ষতা। কোথাও বনজ সম্পদ, কোথাও কৃষির নৈপুণ্য, কোথাও ব্যবসায় বুদ্ধিমত্তা, আবার কোথাও কণ্ঠে, কলমে বা কারিগরি কৌশলে উজ্জ্বল সাফল্যের গল্প।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে — যদি প্রতিটি অঞ্চলের বিশেষত্ব দেশের উন্নয়নচক্রে ভাগাভাগি করে ছড়িয়ে দেওয়া যেত, তাহলে কি বাংলাদেশ আরও দ্রুত উন্নত হতে পারতো না?
ঝালকাঠি, গাছের রাজ্য, সবুজের ভান্ডার:
ঝালকাঠির বাতাসে গাছের গন্ধ। এখানকার মানুষ জানে কীভাবে বীজকে গাছে পরিণত করতে হয়। ফল, ফুল, কাঠ, ঔষধি — এমন কোনো গাছ নেই যা ঝালকাঠির মাটিতে টেকে না।
যদি এই সবুজ বিপ্লবকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে সরকার ঝালকাঠির মতো নার্সারি ও বৃক্ষ উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিটি বিভাগে স্থাপন করতো — তবে বনভূমি বাড়তো, পরিবেশ হতো ভারসাম্যপূর্ণ, আর জলবায়ু সংকটও কিছুটা লাঘব পেত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: সাহসের প্রতীক, দায়িত্বে হতে পারে সীমান্তরক্ষী বাহিনী:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের মধ্যে রয়েছে অদম্য সাহস ও প্রতিবাদী মানসিকতা।
রাষ্ট্র যদি এই সাহসী জনশক্তিকে “সীমান্ত নিরাপত্তা রিজার্ভ বাহিনী” হিসেবে গড়ে তুলতো — তাহলে তা হতে পারতো এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। যুদ্ধ নয়, বরং সতর্কতা ও দায়িত্বের প্রশিক্ষণে তারা দেশের নিরাপত্তা বলয়কে আরও দৃঢ় করতে পারতো।
সাতক্ষীরা: মাছ ও পানির রাজ্য:
সাতক্ষীরার চিংড়ি আজ বিশ্ববিখ্যাত। এখানকার মানুষ জানে কীভাবে লবণাক্ত পানিতেও চাষ সম্ভব।
যদি এই অভিজ্ঞতা বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রামের অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলে প্রয়োগ করা যায়, তবে বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদন দ্বিগুণ হতে পারে।
রপ্তানিতে বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রা, বেকার তরুণদের জন্য খুলবে কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার।
নাটোরের মিষ্টি, বগুড়ার দই, কুমিল্লার রসমালাই — খাদ্যশিল্পে সম্ভাবনার সোনালী অধ্যায়:
প্রতিটি জেলারই নিজস্ব খাদ্য ব্র্যান্ড আছে, কিন্তু সেগুলো জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত নয়।
সরকার যদি “এক জেলা, এক ব্র্যান্ড” (One District One Product) নীতি কার্যকর করে, তবে স্থানীয় ঐতিহ্য জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে।
নাটোরের মিষ্টি বা বগুড়ার দই শুধু দেশের নয়, বিদেশের বাজারেও জায়গা করে নিতে পারবে।
রাজশাহী-রংপুর, সিল্ক ও শস্যের রাজ্য:
রাজশাহীর সিল্ক ও রংপুরের ধান উৎপাদন বিশ্বমানের। কিন্তু আধুনিক মার্কেটিং ও ডিজিটাল সংযোগের অভাবে এখনো পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারেনি।
এই দুটি অঞ্চল যদি “কৃষি-শিল্প সমন্বিত অঞ্চল” হিসেবে বিকশিত হয়, তাহলে কৃষি ও হস্তশিল্প একসাথে চলতে পারে — সৃষ্টি হবে নতুন রপ্তানি সম্ভাবনা।
কুষ্টিয়া: সংস্কৃতি ও দর্শনের রাজধানী:
লালনের ভাবজগত ও বাউল সংস্কৃতি কুষ্টিয়াকে দিয়েছে বিশেষ পরিচয়। এখানকার সংস্কৃতি যদি স্কুল, কলেজ ও পর্যটন খাতে জাতীয়ভাবে প্রচার পেত — তাহলে দেশের সাংস্কৃতিক ঐক্য ও পর্যটন অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হতো।
কুষ্টিয়া হতে পারে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ট্রেনিং ক্যাম্পাস।
নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ: শিল্প ও কারিগরির কেন্দ্র:
নরসিংদীর তাঁতশিল্প ও নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস এক্সপার্টিজ বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড।
যদি দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এই শিল্প প্রশিক্ষণ ও ছোট ইউনিট স্থাপন করা যায় — তবে ঢাকামুখী শ্রমিকচাপ কমবে, বাড়বে গ্রামীণ শিল্পায়ন।
সিলেট: চা ও প্রবাসী পুঁজির শক্তি:
সিলেট শুধু চায়ের জন্য নয়, প্রবাসীদের অর্থনৈতিক অবদানের জন্যও অনন্য।
যদি প্রবাসী বিনিয়োগ ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত করা যায়, তাহলে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
সিলেট মডেল হতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রবাসী-বিনিয়োগ সংস্করণ।
পাবনা-যশোর: কৃষি গবেষণার সম্ভাবনা:
পাবনা ও যশোর দীর্ঘদিন ধরেই কৃষি গবেষণায় এগিয়ে। যশোরের ফল ও সবজি উৎপাদন, আর পাবনার ধান উন্নয়ন প্রকল্প জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখছে।
এই দুই জেলা যদি “কৃষি গবেষণা হাব” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে দেশ আরও খাদ্যে স্বনির্ভর হবে।
চট্টগ্রাম ও খুলনা: বন্দর ও জাহাজশিল্পের ভবিষ্যৎ:
চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, আর খুলনা জাহাজনির্মাণ শিল্পে অগ্রগামী।
দুটি অঞ্চলকে “বন্দর ও নৌশিল্প অর্থনৈতিক করিডর” হিসেবে গড়ে তোলা গেলে তা পুরো দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে।
দেশজ শক্তি, বৈচিত্র্যের ঐক্য:
একটি দেশ তখনই টেকসই উন্নয়ন অর্জন করে, যখন তার প্রতিটি অঞ্চল নিজের শক্তিকে কাজে লাগায় এবং অন্য অঞ্চলকে সাহায্য করে।
এক জায়গার সাহস, অন্য জায়গার সবুজ, আরেক জায়গার কারিগরি দক্ষতা — যদি একে অপরের সঙ্গে বিনিময় হয়, তবে সমগ্র বাংলাদেশই হয়ে উঠবে একটি দক্ষতা-বিনিময় সমাজ।
অঞ্চলভিত্তিক বিশেষত্বকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় যুক্ত করা মানে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, সামাজিক ঐক্য ও গর্বও তৈরি করা।
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা যদি নিজের বিশেষ দক্ষতায় গর্ববোধ করে এবং সেই দক্ষতা অন্য জেলায় ছড়িয়ে দেয় — তবে “বৈচিত্র্যের ঐক্যে উন্নয়ন” হবে বাংলাদেশের সত্যিকারের পরিচয়।