ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুসলমানদের জন্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এই দিনেই মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মহামানব, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আরব উপদ্বীপে তখন অজ্ঞতা, কুসংস্কার, গোত্রীয় বিভেদ ও অবিচারের রাজত্ব চলছিল। এমন অন্ধকার সময়ে তিনি জন্ম নিয়ে মানবজাতির জন্য নিয়ে আসেন শান্তি, ন্যায়বিচার ও আল্লাহর একত্ববাদের শিক্ষা।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে (আমুল ফিল বা হাতির বছর) রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন, আর ছয় বছর বয়সে মাকে হারান। এতিম হিসেবে বেড়ে ওঠা নবীজির শৈশব ছিল কঠিন ও দুঃখে ভরা। শৈশবে তিনি দাদা আবদুল মুত্তালিব ও পরে চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে বড় হন।
তরুণ বয়সে হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সততা, বিশ্বস্ততা ও ন্যায়পরায়ণতার জন্য মক্কার মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁকে “আল-আমিন” বা বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ব্যবসায়েও তিনি সততা ও ন্যায্যতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায় ধ্যানরত অবস্থায় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম ওহি নাজিল হয়। জিবরাইল (আ.) তাঁকে আল্লাহর শেষ রাসূল হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকে তিনি মানবজাতিকে ইসলামের আলোয় আহ্বান জানাতে শুরু করেন। তাঁর ডাকে মানুষ ধীরে ধীরে আল্লাহর একত্ববাদ, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকে।
নবী করিম (সা.)-এর দাওয়াত ছিল ন্যায় প্রতিষ্ঠা, নারী ও পুরুষের সমঅধিকার, দাস মুক্তি, দরিদ্র ও এতিমের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শিরক ও কুসংস্কার থেকে মুক্তির আহ্বান। মক্কায় তিনি অকল্পনীয় নির্যাতন, উপহাস ও বিরোধিতার শিকার হন। তবুও তিনি ধৈর্য হারাননি। পরবর্তীতে মদিনায় হিজরত করে সেখানে ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করেন এবং ন্যায়ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা চালু করেন।
৬৩ বছর বয়সে, হিজরতের ১১তম বছরে মহানবী (সা.) ইন্তেকাল করেন। তিনি বিদায় হজে মুসলিম উম্মাহর জন্য চিরন্তন দিকনির্দেশনা রেখে যান- আমি তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ রেখে যাচ্ছি, তোমরা যদি তা আঁকড়ে ধরো তবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না।
মুসলমানরা ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) নানা আয়োজনের মাধ্যমে পালন করে থাকেন। মসজিদ-মাদরাসায় মিলাদ মাহফিল, কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া, অসহায়দের মাঝে দান ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। কেউ কেউ শোভাযাত্রা ও খাবার বিতরণও করে থাকেন। তবে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো নবীর আদর্শকে জীবনে ধারণ করা।
দৈনিক সময়ের অপরাধচক্র পত্রিকার পক্ষ থেকে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-কে বিশেষভাবে স্মরণ করা হচ্ছে। আমাদের আহ্বান- প্রিয় নবীজির শিক্ষা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবায়ন করা হোক। সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, মানবতা, সহমর্মিতা ও শান্তির আদর্শ আমাদের জীবন ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করাই হবে নবীজিকে প্রকৃত ভালোবাসা জানানো।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) শুধু আনন্দের দিন নয়, এটি আত্মসমালোচনা ও নবীজির আদর্শে জীবন গড়ার দিন। তাঁর জীবন ও শিক্ষা অনুসরণ করলেই মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।