পৃথিবীর প্রতিটি দেশই তার নিজস্ব আইন ও সংবিধান অনুযায়ী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি করে। কোথাও গণতন্ত্র, কোথাও রাজতন্ত্র, কোথাও ধর্মীয় বিধান— এই বৈচিত্র্যের মাঝেই মানুষ ন্যায় খোঁজে, মুক্তি চায়। কিন্তু প্রশ্ন একটাই— “মানুষের তৈরি আইন কি সত্যিই পরিপূর্ণ ন্যায় দিতে পারে?”
১️। মানব সৃষ্ট আইনের সীমাবদ্ধতা:
প্রত্যেক দেশ তার নিজস্ব “সংবিধান, সংস্কৃতি, সামাজিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক কাঠামো” অনুযায়ী আইন তৈরি করে।
তাই—এই বৈষম্য মূলত মানুষের সীমাবদ্ধ বুদ্ধি, স্বার্থ ও সমাজ কাঠামোর পার্থক্য থেকেই আসে।
এই আইনগুলোর ন্যায়বিচার অনেক সময় আপেক্ষিক (relative justice)— এক দেশে ন্যায় মনে হলেও অন্য দেশে অন্যায় বলে মনে হয়।
মানুষের আইন সর্বদা আপেক্ষিক।
* এক দেশে যেটি অপরাধ, অন্য দেশে সেটি বৈধ।
* এক বিচারক যেখানে মুক্তি দেন, অন্য বিচারক একই ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড দেন। কারণ আইন রচয়িতা মানুষ নিজেই সীমাবদ্ধ— তার জ্ঞান, মনোভাব ও অবস্থান সবই সময় ও স্বার্থনির্ভর।
এই সীমাবদ্ধতার ফলেই ন্যায়বিচার কখনো কখনো “বৈষম্যে পরিণত হয়”, আর সংক্ষুব্ধ মানুষের হৃদয়ে জন্ম নেয় “অদৃশ্য আর্তনাদ”— “হে সৃষ্টিকর্তা, তুমি কি দেখছো না?”
২️। সৃষ্টিকর্তার ন্যায়ের পরিপূর্ণতা:
কোরআন, বাইবেল, গীতা, তৌরাতে এক বিষয় সর্বজনস্বীকৃত—
“সৃষ্টিকর্তা ন্যায়পরায়ণ, আর তাঁর বিচার অচ্যুত।”
মানুষের আদালত হয়তো প্রমাণ, সাক্ষী ও যুক্তির সীমায় আবদ্ধ,
কিন্তু সৃষ্টিকর্তার আদালতে—
মন, উদ্দেশ্য, গোপন চিন্তা ও অদেখা ক্ষত পর্যন্ত উন্মুক্ত হয়ে যায়।
“আল্লাহ বিচার করেন সত্য দ্বারা, আর তারা যাদেরকে আহ্বান করে আল্লাহ ছাড়া, তারা কিছুই বিচার করতে পারে না।”
— (সূরা মু’মিন, ৪০:২০)
অর্থাৎ, পৃথিবীর যেসব বিচার ধর্মগ্রন্থসম্মত নয় বা যেখানে মানুষ ইচ্ছাকৃত অন্যায় করে,
সেসব বিচার একদিন “পুনরায় পর্যালোচিত হবে সৃষ্টিকর্তার চূড়ান্ত আদালতে।”
৩️। অন্যায় বিচারকদেরও বিচার:
যখন কোনো বিচারক সত্য জানার পরও মিথ্যার পক্ষে রায় দেন,
যখন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরপরাধকে শাস্তি দেন,
যখন কোনো সাক্ষী মিথ্যা বলে ন্যায়কে হত্যা করে—
তখন তারা শুধু মানুষের প্রতি নয়, “সৃষ্টিকর্তার কাছেও অপরাধী হয়ে ওঠেন।”
“যে ব্যক্তি আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ী বিচার করে না, তারা জালিম।”
— (সূরা মায়িদা, ৫:৪৫)
অর্থাৎ, বিচারকের পোশাক পরা মানেই মুক্তি নয়;
বরং সেই পোশাকের ভার বহন করতে না পারলে সেটি একদিন “বিচার দিবসে শিকলে পরিণত হবে।”
আরেক জায়গায় বলা আছে:
“তুমি বিচার করো না যা তুমি জানো না, আল্লাহ জানেন যা তোমরা জানো না।”
অর্থাৎ, মানুষ যতই বিচার করুক, তা কখনো “পূর্ণাঙ্গ বা চূড়ান্ত ন্যায়বিচার নয়।”
৪️। চূড়ান্ত ন্যায় ও পরকালীন প্রতিশোধ:
মানুষের আদালত সাময়িক,কিন্তু সৃষ্টিকর্তার আদালত “চূড়ান্ত ও চিরস্থায়ী। “যিনি অন্যায়ভাবে দণ্ড পেয়েছেন, তাঁর কান্না যদি মাটির নিচে গিয়েও ন্যায়ের জন্য প্রার্থনা করে— সৃষ্টিকর্তা সেই প্রার্থনা শোনেন।
“যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করেছে, সে তা দেখবে; আর যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করেছে, সেও তা দেখবে।”
— (সূরা আল-জিলযাল, ৯৯:৭–৮)
এমনকি কোনো বিচারক যদি এক ফোঁটা ঘুষ নেয়, বা ক্ষমতার ভয়ে অন্যায় রায় দেয়, তাও তাঁর হিসাব থেকে বাদ যাবে না। কারণ, সৃষ্টিকর্তার ন্যায় “অন্ধ নয়, কিন্তু সর্বদর্শী।”
৫। চূড়ান্ত বিচার: (Divine Re-judgment)
একদম সঠিকভাবে অনুভব করলে —
“সৃষ্টিকর্তা এসব বিচার পুনরায় করতে পারেন।”
ইসলামি দৃষ্টিতে, এই ধারণাই “আখিরাতের বিচার দিবসের মূল দর্শন।”
যেখানে—
* কোনো মানুষ, বিচারক বা রাষ্ট্র কাউকেই পক্ষপাতিত্ব করা হবে না,
* কেউ বঞ্চিত থাকলে তার পূর্ণ ন্যায়বিচার প্রদান করা হবে,
* এমনকি কারো চোখের পানি বা অবদমিত আর্তনাদও উপেক্ষিত থাকবে না।
মানুষের বিচার যতই পরিপূর্ণ মনে হোক না কেন, তা কেবলই সময়িক ছায়া।
চূড়ান্ত ন্যায়, প্রকৃত বিচার ও সত্যের স্বীকৃতি—
সবশেষে ফিরে যায় এক জায়গায়—
“সৃষ্টিকর্তার আদালতে।”
যেখানে কোনো জাতির ভেদ নেই, কোনো প্রভাবশালী নেই,
শুধু সত্য আর মিথ্যার হিসাবই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করে।