দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ও বৈদেশিক বাণিজ্যের লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নির্মূল এবং সামাজিক মাধ্যমে চলমান অপপ্রচারের বিরুদ্ধে অবস্থান জানাতে আজ জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘সচেতন নাগরিক ও ছাত্র জনতা’ সংগঠনের ব্যানারে এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বক্তারা বলেন,
বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ, যার আর্থিক মূল্য ২০২৪ সালে ছিল প্রায় ১১০ বিলিয়ন ডলার, চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ধীরগতির পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে।
বক্তারা তাই জাতীয় স্বার্থে বন্দরের ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানের বেসরকারি অপারেটর যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত প্রধান যুক্তি ও দাবি
১. অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
-
টিআইবির তথ্যমতে, বন্দরে ‘স্পিড মানি’ ছাড়া স্বাভাবিক কাজ সম্পন্ন করা কঠিন—ফলে বছরে প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার (১৩ হাজার কোটি টাকা) অতিরিক্ত খরচ জাতীয় অর্থনীতিতে চাপ পড়ে।
-
এই অতিরিক্ত খরচ সাধারণ ভোক্তার উপর পড়ে, ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়।
-
বিশ্বব্যাংকের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান বন্দরগুলোর মধ্যে শুধু চট্টগ্রামেই কোনো আন্তর্জাতিক মানের বেসরকারি অপারেটর নেই।
২. জাহাজ জট নিরসন ও অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি
-
বর্তমানে চট্টগ্রামে যেখানে জাহাজ খালাস করতে ৭–১২ দিন লাগে, সেখানে আধুনিক অপারেটররা তা ৪৮ ঘণ্টায় সম্পন্ন করতে পারে।
-
২০০৭ সালে আংশিক সংস্কারে টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম ১১ দিন থেকে ৪ দিনে নেমে এসেছিল—যা প্রমাণ করে সক্ষমতা রয়েছে, দরকার শুধু দক্ষ ব্যবস্থাপনা।
৩. সরকারি কোষাগারের অর্থ ব্যয় না করে বিশাল বিনিয়োগ
-
বৈশ্বিক অপারেটররা BOT মডেলে নিজ অর্থে অবকাঠামো গড়ে।
-
লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনালে APM Terminals-এর ৫৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাবের উদাহরণ তুলে ধরা হয়।
৪. সিন্ডিকেট ভেঙে স্বচ্ছতা নিশ্চিত
-
জাহাজ খালাস, কাস্টমস ও পণ্য সরবরাহে বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা অবৈধ সিন্ডিকেট আধুনিক অটোমেশন ব্যবস্থায় নিজে থেকেই ভেঙে যাবে।
-
আন্তর্জাতিক অপারেটররা কড়া অডিট ট্রেইল ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করে—ফলে দুর্নীতির সুযোগ কমে যাবে।
৫. সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে
-
“বন্দর বিক্রি হয়ে যাচ্ছে”—এ ধারণা সম্পূর্ণ গুজব ও বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করা হয়।
-
সরকার ল্যান্ডলর্ড পোর্ট মডেল অনুসরণ করবে—
-
জমির মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে
-
নিরাপত্তা, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন সরকারের অধীন
-
অপারেটর শুধু কারিগরি সেবা প্রদান করবে
-
৬. কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও শ্রমিক সুরক্ষা
-
বেসরকারি অপারেটর এলে চাকরি কমবে—এই ভীতি ভিত্তিহীন।
-
বরং নতুন প্রযুক্তি, বর্ধিত কার্যক্রম ও স্বচ্ছতা আসলে
-
আরও কর্মসংস্থান
-
উন্নত প্রশিক্ষণ
-
আন্তর্জাতিক মানের বেতন-ভাতা
নিশ্চিত হবে।
-
বক্তাদের চূড়ান্ত আহ্বান
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি বক্তারা বলেন—
“আবেগ দিয়ে নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতা দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।”
মুষ্টিমেয় দুর্নীতিবাজদের অপপ্রচারে কান না দিয়ে দেশের প্রবৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিশ্চিত করতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।
এটি জাতীয় সম্পদ বিক্রি নয়, বরং জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার কার্যক্রম বলে উল্লেখ করেন বক্তারা।