বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়—বড় আকারের মাদকদ্রব্য উদ্ধার অভিযানের পর সেগুলোকে পুলিশ, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আদালতের নির্দেশে রোলারের নিচে পিষ্ট করা হয়। হাজার হাজার বোতল ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন ইত্যাদি জনসমক্ষে ধ্বংস করে “রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান” প্রদর্শন করা হয়।
কিন্তু একই রাষ্ট্র যখন অবৈধ স্বর্ণ বা মূল্যবান ধাতু উদ্ধার করে, তখন সেগুলোকে পিষ্ট নয়, বরং সংরক্ষণ করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের লকারে। প্রশ্ন জাগে—মাদক যেমন অবৈধ, স্বর্ণও তো অবৈধভাবে এসেছে! তাহলে একটিকে ধ্বংস করা হয়, অন্যটি কেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যোগ হয়?
আইনের ব্যাখ্যা বলছে: দুই ধরনের অপরাধ, দুই ধরনের আচরণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত মাদকদ্রব্য আদালতের অনুমতি নিয়ে ধ্বংস করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় উপস্থিত থাকতে হয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ড্রাগ কন্ট্রোল প্রতিনিধি, পুলিশ ও সাংবাদিকদের।
কারণ—এগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ও রাষ্ট্রীয় ব্যবহারের অনুপযুক্ত।
অন্যদিকে, কাস্টমস আইন ১৯৬৯ ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুযায়ী, অবৈধভাবে আমদানি বা পাচার হওয়া স্বর্ণ বাজেয়াপ্ত হলে সেটি রাষ্ট্রীয় সম্পদে রূপান্তর করা যায়।
বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তা বাংলাদেশ ব্যাংক বা কাস্টমস ট্রেজারিতে জমা রাখা হয়—পরবর্তীতে নিলাম, পুনঃগলন বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যোগ করা হয়।
অর্থাৎ, মাদক ধ্বংস হয় জনস্বাস্থ্য রক্ষায়, আর স্বর্ণ সংরক্ষিত হয় অর্থনৈতিক সম্পদ রক্ষায়।
রাষ্ট্র কি তবে ‘নৈতিক’ নয়, ‘অর্থনৈতিক’?
এখানেই নৈতিক প্রশ্ন।
একটি রাষ্ট্র যখন বলে—“মাদক ধ্বংস করতে হবে, কারণ এটি সমাজ ধ্বংস করে”, তখন সেই একই রাষ্ট্র চোরাচালানকৃত স্বর্ণকে নিজের রিজার্ভে যুক্ত করে।
তাহলে কি রাষ্ট্র আসলে অর্থের কাছে নত?
সমালোচকরা বলছেন, এটা রাষ্ট্রের ‘নৈতিক দ্বিচারিতা’।
একদিকে জনস্বাস্থ্যের নামে নীতির প্রদর্শন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক লাভের জন্য অবৈধ সম্পদকে বৈধ সম্পদে পরিণত করা—এ দুইয়ের মধ্যে নৈতিক ফারাক থেকেই রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের অবিশ্বাস বাড়ছে।
অর্থনৈতিক যুক্তি: রাষ্ট্র লোভী নয়, হিসেবি
অর্থনীতিবিদরা অবশ্য বলছেন, বিষয়টি লোভ নয়, বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
স্বর্ণ একটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদ—যা রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। তাই ধ্বংস না করে সংরক্ষণই যৌক্তিক।
অন্যদিকে মাদক ধ্বংস ছাড়া বিকল্প নেই, কারণ এর কোনো বৈধ ব্যবহার রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়।
কিন্তু এখানেই আবার দ্বন্দ্ব—রাষ্ট্র মাদককে “ক্ষতিকর” আর স্বর্ণকে “লাভজনক” হিসেবে দেখে, অথচ দুটোই “অবৈধভাবে প্রাপ্ত”।
আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতার প্রশ্নও থেকে যায়:
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, উদ্ধারকৃত মাদক ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় যেমন অপব্যবহারের অভিযোগ আছে, তেমনি উদ্ধারকৃত স্বর্ণের হিসাবও অনেক সময় গায়েব হয়ে যায়।
কিছু রিপোর্টে দেখা গেছে, জব্দকৃত স্বর্ণের পরিমাণ আদালতে জমা দেওয়ার সময় “কমে যায়”, যা দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়।
ফলে, আইনের ব্যাখ্যা যতই যুক্তিযুক্ত হোক, বাস্তবে নৈতিকতার প্রশ্ন উঁকি দেয়ই।
নীতিগত বিশ্লেষণ: রাষ্ট্রের দুই মুখ:
বিশ্লেষকদের মতে, এখানে রাষ্ট্রের দুটি রূপ স্পষ্ট:
1. নৈতিক রাষ্ট্র — যে মাদককে ধ্বংস করে সমাজ রক্ষা করতে চায়,
2. অর্থনৈতিক রাষ্ট্র — যে স্বর্ণকে রেখে দেয় নিজের সম্পদ বাড়াতে।
এ দুইয়ের মাঝে তৈরি হয় রাষ্ট্রের নৈতিক বিভাজন, যা দীর্ঘমেয়াদে জনবিশ্বাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এমন দ্বৈত নীতির শেষ কথায় — নীতি না লোভ?
“রাষ্ট্র মাদক ধ্বংস করে জনস্বাস্থ্য রক্ষায়, কিন্তু স্বর্ণ রেখে দেয় নিজস্ব রিজার্ভে। আইন তা-ই বলে, কিন্তু নৈতিকতার আদালতে প্রশ্ন থেকেই যায়—। রাষ্ট্রের বিবেক কি কেবল মূল্যবান ধাতু দেখলেই নরম হয়ে যায়?”