বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের এক অনন্য নক্ষত্র ফকিরা, যিনি ছোট-বড় চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন, আজ জীবনসংগ্রামের কঠিন লড়াইয়ে লিপ্ত। প্রায় সাতশোর বেশি ছবিতে তার অভিনয়ের ছোঁয়া রয়েছে, কিন্তু গত এক বছরে তিনবার স্ট্রোকের আঘাতে এই গুণী শিল্পী সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। বর্তমানে তিনি কথা বলতেও অক্ষম, চার দেওয়ালের মধ্যে অসহায়ের মতো দিন যাপন করছেন। চিকিৎসার ভারে পরিবার দিশেহারা, আর্থিক সংকটে চিকিৎসা অব্যাহত রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
ফকিরা ছিলেন চলচ্চিত্রপাড়ার সকলের কাছে পরিচিত ও প্রাণবন্ত এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসা ছিল অপার শুটিং না থাকলেও প্রায় প্রতিদিন তিনি বিএফডিসির (বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন) সেটে ছুটে যেতেন। সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা, সেটে সময় কাটানো এবং চলচ্চিত্রের পরিবেশে আনন্দ খোঁজা এসবই ছিল তাঁর জীবনের অংশ। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে সেই প্রাণচাঞ্চল্য আর দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘ অসুস্থতায় তিনি এখন সম্পূর্ণ ঘরবন্দি, শয্যাশায়ী অবস্থায়। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সদস্য হিসেবে তাঁর অবদান অসামান্য। খলনায়কের ভূমিকায় ভয়ংকর, কমেডিতে হাস্যরসের স্রোত বইয়ে দিয়ে, পার্শ্বচরিত্রে গভীরতা যোগ করে তিনি অসংখ্য ছবিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর অভিনয়ের নৈপুণ্য সহশিল্পী, প্রযোজক ও পরিচালকদের কাছে ছিল ভরসার প্রতীক। তিন দশকেরও অধিক সময় ধরে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি বাংলাদেশি সিনেমার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
কিন্তু আজ সেই শিল্পী চরম অসহায়ত্বের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। স্ট্রোকের পর পর আঘাতে তাঁর শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে, কথোপকথনের সামর্থ্যও নেই। পরিবারের সদস্যরা দিনরাত প্রাণান্ত চেষ্টায় তাঁকে সুস্থ করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতা এই সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তুলেছে। চিকিৎসা খরচের ভারে তারা একেবারে হতাশার দ্বারপ্রান্তে। সহকর্মী শিল্পীরা বলছেন, “ফকিরার মতো নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে ধন্য করেছেন। তাঁদের অবদান জাতীয় সম্পদ—এমন সময়ে তাঁকে একা রেখে দেওয়া যায় না।” চলচ্চিত্রপ্রেমীরাও সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর পক্ষে সমর্থন জানিয়ে সাহায্যের আহ্বান জানাচ্ছেন।
এই ঘটনা শুধু ফকিরার ব্যক্তিগত দুঃখ নয়, পুরো চলচ্চিত্র জগতের জন্য কষ্টের বিষয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিল্পীদের সামনে স্বাস্থ্য ও আর্থিক নিরাপত্তার অভাব এক বড় সমস্যা। অনেক গুণী শিল্পী পরবর্তী জীবনে অভাবের মুখোমুখি হন, যা সমাজের জন্য লজ্জার। ফকিরার এই সংকটময় অবস্থা রাষ্ট্র ও সমাজকে সচেতন করার এক উদাহরণ। শিল্পী সমিতি, সরকারের পাশাপাশি সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। একটি শিল্পীকল্যাণ তহবিল গঠন বা নিয়মিত স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিল্পী চিকিৎসা বা অভাবের কারণে কষ্ট না পান।
চলচ্চিত্রের অঙ্গনে সকলে আশা করছেন, দ্রুত সুস্থ হয়ে ফকিরা আবার তাঁদের মাঝে ফিরে আসবেন। তাঁর পাশে দাঁড়াতে সকলের সহযোগিতা কামনা করা হচ্ছে। এই সংকটের মধ্যেও তাঁর অবদানের স্মৃতি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে জাগিয়ে রাখবে। ফকিরার লড়াই যেন সকলের জন্য এক শিক্ষা হয়ে ওঠে।