নাটক ও সিনেমা— উভয়ই বিনোদনের মাধ্যম, কিন্তু বাস্তবতা উপস্থাপনের ধরন ও লক্ষ্য অনেক ভিন্ন।
নাটকে গল্প, সংলাপ ও চরিত্রের বাস্তবতা মুখ্য থাকে;
আর সিনেমায় গল্পের সঙ্গে যোগ হয় দৃশ্য, বাণিজ্য ও দর্শকের মনোযোগ টানার প্রতিযোগিতা।
এই প্রতিযোগিতাই আজ অনেক সময় নায়িকার পোশাক, উপস্থিতি ও দেহভঙ্গিকে “বাণিজ্যিক উপাদান”-এ পরিণত করেছে।
১️⃣ নাটকের তুলনায় সিনেমার দৃশ্যনির্ভরতা:
নাটক মূলত সংলাপনির্ভর; দর্শক গল্প ও চরিত্রের মধ্যে ডুবে যায়।
কিন্তু সিনেমা ভিজ্যুয়াল মিডিয়া— এখানে ক্যামেরা, আলো, রঙ, পোশাক ও পরিবেশ গল্পের ভাষা হয়ে ওঠে।
ফলে নির্মাতারা প্রায়ই মনে করেন “দৃশ্যমান আকর্ষণ” বাড়াতে পোশাক বা গ্ল্যামার যোগ করা দরকার।
👉 এক্ষেত্রে অনেক নির্মাতা যুক্তি দেন —
“এটা চরিত্রের দাবি”।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, গল্পের প্রয়োজনে নয়, বাজারের চাহিদায় পোশাক ছোট হয়।
–
২️⃣ বাণিজ্য ও দর্শক টানার প্রতিযোগিতা:
বর্তমান সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি মূলত বিনিয়োগ নির্ভর ব্যবসা।
যেখানে প্রযোজক, OTT প্ল্যাটফর্ম বা প্রমোটাররা চায় দর্শক সংখ্যা বাড়ুক—
আর দর্শক সংখ্যা বাড়ানোর সহজতম উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্ল্যামার মার্কেটিং।
* ট্রেইলার, পোস্টার, থাম্বনেইল— সব জায়গায় “চোখে পড়ার মতো নারী চিত্র” ব্যবহার হয়।
* বিদেশি বাজারের প্রভাব, সোশ্যাল মিডিয়ার গ্ল্যামার কালচার, আর দর্শকের কৌতূহল— সব মিলিয়ে পোশাক হয়ে যায় পণ্যের মতো বিক্রয় উপাদান।
এই বাস্তবতা থেকেই সিনেমায় নারীকে অনেক সময় “গল্পের চরিত্র” নয়, বরং “চাহিদার বস্তু” হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
৩️⃣ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও নারীচিত্রের বাণিজ্যিকীকরণ
নারীকে যদি শুধুই দৃষ্টি আকর্ষণের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তবে সেটা কেবল সিনেমার সমস্যা নয় —
এটা একধরনের সমাজের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিফলন।
ভারতের খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন —
> “চলচ্চিত্রের কাজ মানুষকে দেখা, তাকে ভোগ করা নয়।”
কিন্তু আজকের অনেক মূলধারার সিনেমা নারীকে ভোগ্যচিত্রে রূপ দিচ্ছে।
ফল —
নারী চরিত্রের গভীরতা হারাচ্ছে,
আর নায়িকারা পরিণত হচ্ছেন ট্রেন্ড বা ফ্যাশনের প্রতীক।
৪️⃣ গল্প বলার ভাষা নাকি আয় বাড়ানোর কৌশল?
সিনেমা আদতে গল্প বলার মাধ্যম।
একটি ভালো সিনেমা দর্শককে ভাবতে শেখায়, সমাজের আয়না ধরে।
কিন্তু যখন সিনেমা শুধুই “চোখে লাগার খেলা” হয়ে যায়, তখন গল্প চাপা পড়ে, আর নারী হয় দর্শক টানার হাতিয়ার।
অর্থাৎ—
“সিনেমা তখন আর গল্প বলতে চায় না; আয়ের রাস্তা খুলতে চায়।”
এ কারণেই অনেক অভিনেত্রী যখন নাটক থেকে সিনেমায় যান,
তাদের বলা হয় —
“দর্শকের সঙ্গে কানেকশন রাখতে হলে একটু গ্ল্যামারাস হতে হবে।”
এভাবে ধীরে ধীরে পোশাক, চরিত্র ও উপস্থাপনার ধরন বদলে যায়।
৫️⃣ মুক্তির পথ কোথায়?
নারী যদি শুধু বাজারের পণ্য না হয়ে শিল্পের অংশ হতে চান, তবে দায়িত্ব শুধু তার নয় —
দায়িত্ব নিতে হবে নির্মাতা, প্রযোজক, ও দর্শক— তিন পক্ষকেই।
নারীর পোশাক নয়, তার চরিত্রের শক্তি ও ভাবনার গভীরতাই সিনেমার প্রাণ হওয়া উচিত।
যেদিন দর্শক গ্ল্যামারের চেয়ে গল্পে মন দেবে,
সেদিন নায়িকাদের পোশাকের দৈর্ঘ্য নয়, তাদের চিন্তার দৈর্ঘ্য নিয়েই হবে আলোচনার বিষয়।
স্বাধীনতা যেমন দায়িত্ব ছাড়া বিপজ্জনক,
তেমনি শিল্পও নৈতিকতা ছাড়া বাণিজ্যে পরিণত হয়।
সিনেমা যদি শুধু লাভের নয়, সত্য বলার মাধ্যম হতে চায়,
তবে নারীকে ভোগ্যচিত্র নয়, মানবিক চরিত্র হিসেবে দেখাতে হবে।