বাংলাদেশের পাহাড়ি জনপদ সাজেক, দীঘিনালা, বাঘাইহাট- আজ পর্যটকদের ভিড়ে সরব, ক্যামেরার ফ্ল্যাশে উজ্জ্বল। কিন্তু এই পাহাড়ের প্রতিটি ধূলিকণা একদিন ভিজেছিল এক সৈনিকের রক্তে, যিনি নিজের জীবন দিয়ে পাহাড়ের শান্তি রক্ষা করেছিলেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ (অব.)-এর স্মৃতিচারণা “কে বাঁশি বাজায় তপ্ত দুপুরে, নির্জন পাহাড়ে?” সেই অজানা বীরত্বের ইতিহাসকে আবারও সামনে নিয়ে আসে।
১৯৮৮ সালের ডিসেম্বর। সদ্য কমিশনপ্রাপ্ত সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট ইউসুফ ও সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট গৌতম যোগ দিলেন বাঘাইহাটে ১ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারিতে। তখন পাহাড়ে শান্তিবাহিনীর তৎপরতা প্রবল। প্রতিদিনের দায়িত্ব ছিল ‘রুট প্রটেকশন’ – দীঘিনালা থেকে বাঘাইহাট পর্যন্ত দুর্গম রাস্তায় সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।
সেই রাস্তা ছিল ভয়াবহ বিপজ্জনক — কাদা, পাথর আর সরু বাঁকানো পথ; একটু বৃষ্টি হলেই এক হাঁটু কাদা জমত। চলাচল করত কেবল আর্মির গাড়ি, ফরেস্ট বিভাগের ডোজার বা মাঝে মাঝে কোনো চান্দের গাড়ি। এ রাস্তায় এক মুহূর্তের অসতর্কতা মানেই ছিল প্রাণঘাতী বিপদ।
ব্রিগেডিয়ার ইউসুফ লেখেন, “আমাদের প্রতিদিনের কাজ ছিল সকালে টহল দিয়ে চৌকিগুলোতে সৈনিকদের তুলে দেওয়া আর বিকেলে তাদের ফিরিয়ে আনা।” পাহাড়ের উঁচু চূড়ায় ছোট ছোট প্রহরাচৌকি, প্রতিটিতে পাঁচ-ছয়জন সৈনিক। তারা দিনরাত পাহারা দিতেন যেন কোনো হামলা বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ঘটতে না পারে।
একদিন সকালে খবর এলো-সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট গৌতমের টহল দল শান্তিবাহিনীর অ্যাম্বুশে পড়েছে। মুহূর্তেই ইউসুফ ছুটে গেলেন ঘটনাস্থলে। পৌঁছে জানলেন, গৌতম গুলিবিদ্ধ হননি; বরং সাহসিকতার সঙ্গে পাল্টা আক্রমণ করে সন্ত্রাসীদের পিছু নিয়েছেন। কিন্তু সেই সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন এক তরুণ সৈনিক-ল্যান্স নায়েক আরজান আলী।
একটি মাত্র গুলি, কিন্তু তা তার উরুর ধমনী ছিঁড়ে দিয়েছিল। তিন মিনিটের মধ্যে তিনি নিঃশেষ হয়ে যান নিজের রক্তে।আরজান আলী তখন পাহাড়ের পোষ্টে দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর সাহস, নিষ্ঠা ও কর্তব্যপরায়ণতা সেই দিনের রক্তাক্ত দুপুরে পাহাড়ের ইতিহাসে এক অমর দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
ব্রিগেডিয়ার ইউসুফের স্মৃতিতে আজও বাজে আরজান আলীর বাঁশির সুর-
খুব সুন্দর বাঁশি বাজাতো ও। গুমোট, বিষণ্ণ দুপুরে, ঢেউ খেলানো রোদ্দুরে অনেক দূর পর্যন্ত ভেসে যেতো সেই বাঁশির সুর। আজও চোখ বুজলে শুনতে পাই সেই বিষণ্ণ বাঁশির আওয়াজ।
এই এক বাঁশির সুর যেন পাহাড়ের প্রতিটি পাথরে প্রতিধ্বনিত হয় আজও।
পাহাড়ে শান্তির জন্য রক্তের বিনিময়
যে পথ ধরে আজ মানুষ সাজেক ভ্রমণে যায়, রিল তোলে, পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করে—সেই পথ একদিন ছিল মৃত্যু ফাঁদের মতো বিপজ্জনক। তখন প্রতিটি মোড়ে ছিল আতঙ্ক, প্রতিটি ঝোপে লুকিয়ে ছিল হামলার সম্ভাবনা। সেই রাস্তাকে নিরাপদ করে তুলেছিল অসংখ্য সৈনিকের আত্মত্যাগ।
তাদের অগণিত কেউ আজও অজানা, কেউবা নামহীন সমাধিতে ঘুমিয়ে আছেন। কিন্তু তাঁদেরই কারণে আজ পাহাড়ে নির্মিত হয়েছে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, এবং এক নতুন জীবনের সুর।
ব্রিগেডিয়ার ইউসুফের লেখা শুধু যুদ্ধের গল্প নয়; এটি এক প্রজন্মের ত্যাগের দলিল। তাঁর ভাষায়,
আজ যারা সাজেক যায়, তারা বোঝে না এই শান্তির মূল্য কত বড়। যদি সেই সৈনিকরা বুকের পাঁজর দিয়ে এই পাহাড় আগলে না রাখত, তাহলে কেউই এখানে পৌঁছাতে পারত না।
শান্তি ও মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা
আজ যখন আমরা পাহাড়ে মানবাধিকার, উন্নয়ন বা পর্যটনের কথা বলি, তখন মনে রাখা জরুরি যে এই অগ্রযাত্রার পেছনে কত নামহীন সৈনিকের ত্যাগ লুকিয়ে আছে।
ল্যান্স নায়েক আরজান আলী তাঁদেরই একজন—যিনি নিজের প্রাণ দিয়ে পাহাড়ের মাটি রক্ষা করেছেন। তাঁর বাঁশির সুর আজও যেন স্মরণ করিয়ে দেয়, শান্তি কখনো বিনা মূল্যে আসে না।
পাহাড়ের সেই তপ্ত দুপুরে, সূর্যের দগ্ধ আলোয় নিঃশব্দে বাজছিল এক বাঁশির সুর। সেই সুর আজও বয়ে যায় চেঙ্গী নদীর জলে, ভেসে আসে সাজেকের পাহাড়ি বাতাসে।
আরজান আলীর মতো অসংখ্য সৈনিকের আত্মত্যাগের ফলেই আজ আমরা শান্তির এই পাহাড় দেখতে পাই।
তাঁদের প্রতি চিরন্তন শ্রদ্ধা- যে বাঁশি একদিন তপ্ত দুপুরে বাজতো, তা আজও আমাদের স্বাধীনতার গান হয়ে বাজে।