পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী লক্ষীবাজারে সামাজিক সংগঠন ঢাকা মৈত্রী আয়োজিত হলো মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক এক বিশেষ কর্মশালা। শুক্রবার (২০২৫) বিকেলে আয়োজিত এই কর্মশালায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন অভিজ্ঞ সাইকোথেরাপিস্ট ডলি আক্তার। তিনি ডিপ্রেশন, এ্যাংজাইটি ও মানসিক চাপ মোকাবিলায় কার্যকর উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। অংশগ্রহণকারীদের মানসিক শক্তি গড়ে তুলতে বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক কৌশল এবং অনুশীলনের দিকনির্দেশনা দেন। তাঁর মতে- মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষা করলে তা ধীরে ধীরে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সচেতনতা ও ইতিবাচক চিন্তার অভ্যাস একজন মানুষকে সুস্থ ও পরিপূর্ণ জীবন উপহার দিতে পারে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় আকর্ষণীয় কুইজ শো, যা পরিচালনা করেন অনুষ্ঠানের সমন্বয়ক সাকিব আহমেদ। কুইজের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নানা প্রশ্নের উত্তর দেন এবং নতুন জ্ঞান আহরণ করেন।
সেশন শেষে অংশগ্রহণকারীদের হাতে সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়। সার্টিফিকেট বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নিজাম উদ্দিন জিটু, সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক গণকণ্ঠ। তিনি বলেন- শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি মানসিক সক্ষমতা তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আমেনা খাতুন ইভা , সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক সময়ের অপরাধ চক্র; নুরুল কবির, সহকারী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; এবং শহীদুল্লাহ কালু, সাবেক ছাত্রনেতা ও প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। তাঁদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে এ ধরনের আয়োজন তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করার পাশাপাশি সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি মোরসালিন বাবু। উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক এ আই জাভেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রুবেল আহমেদসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও এটি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যেখানে ডিপ্রেশন ও এ্যাংজাইটি প্রধান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানায়, বাংলাদেশে প্রতি ৩ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ১ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, যা জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
গ্রামীণ এলাকায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রায় অনুপস্থিত। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয় প্রধানত ঢাকা ও কিছু বড় শহরে। সরকারি হাসপাতালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা সীমিত, আর বেসরকারি সেবার খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অনেক সময় মানুষ কুসংস্কার, সামাজিক ভয় বা লজ্জার কারণে চিকিৎসা নেন না।
এছাড়া আত্মহত্যার হারও বাংলাদেশে একটি উদ্বেগজনক বিষয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ মানসিক সমস্যার কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এ প্রবণতা বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করা, স্কুল-কলেজে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা চালু করা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। পাশাপাশি সরকার ও বেসরকারি খাতে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সবার নাগালে আসবে।
পুরান ঢাকার এই অনুষ্ঠানটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেছেন, এ ধরনের কার্যক্রম নিয়মিত আয়োজনের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।