ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, বৈষম্য ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে রাজধানীর শ্যামপুরের জুরাইনে অবস্থিত ঢাকা রেশনিং কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে ভুক্তভোগী আবেদনকারীরা।
রবিবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচিতে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন বলে আয়োজকদের দাবি। “ন্যায্য নিয়োগ চাই, দুর্নীতি নয়”—এ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে জুরাইন রেশনিং অফিসের সামনের এলাকা।
প্রতিবাদকারীরা অভিযোগ করেন, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ খ্রি. রাজধানীর রমনায় ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা রেশনিং কর্তৃক ওএমএস ডিলার নিয়োগ ২০২৫-এর উন্মুক্ত লটারি। কিন্তু ওই লটারিতে ব্যাপক অনিয়ম, পক্ষপাত ও সাজানো নাটকীয়তা ঘটেছে বলে তারা দাবি করেন।
তাদের অভিযোগ, অনেক আবেদনকারী মোবাইল ফোনে বার্তা পাননি, আবার অনেকে তালিকাভুক্ত থাকলেও কোনো নোটিশ না পাওয়ায় উপস্থিত হতে পারেননি। এতে স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে।
ভুক্তভোগী আবেদনকারীরা বলেন, “এই লটারিতে এমন অনেক নাম উঠেছে যারা কখনো আবেদনই করেননি। অন্যদিকে বহু যোগ্য প্রার্থী বাদ পড়েছেন।”
ভুক্তভোগীদের উত্থাপিত দাবিসমূহ:
১ ওএমএস নীতিমালা ২০২৪ অনুসারে পূর্বের বৈধ ডিলারদের বাদ দেওয়া যাবে না, যদি না তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ থাকে।
২অঞ্চলভিত্তিক সকল আবেদনকারীর তালিকা প্রকাশ করতে হবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে নাম উত্তোলন নিশ্চিত করতে হবে।
৩ ২৯ সেপ্টেম্বরের লটারিটি বাতিল করে পুনরায় ন্যায্যভাবে আয়োজিত করার দাবি জানান তারা।
৪️ঘুষ, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ডিলার নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
৫️ রেশনিং কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করতে হবে।
৬️ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাত ও দুর্নীতির অভিযোগে বিচার বিভাগীয় তদন্ত গঠন করতে হবে।
৭️ ওএমএস ডিলার নিয়োগে বাণিজ্য ও ঘুষ সম্পূর্ণ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়।
৮️ মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরিদর্শন ও কঠোর তদারকি বাড়াতে হবে।
৯️ অবিক্রীত পণ্য গোপনে বিক্রির ঘটনা বন্ধ করতে এবং সঠিকভাবে বিক্রয় রিপোর্ট বাস্তবায়ন করতে হবে।
অনিয়মকারী ডিলারদের বিরুদ্ধে প্রমাণসাপেক্ষ শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।
১১️ প্রতিটি ওএমএস বিক্রয় কেন্দ্রের শুরু ও শেষে ভিডিও কলের মাধ্যমে বিক্রয় নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
১২️ কালোবাজারি প্রতিরোধে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে।
১৩️ রোটেশন পদ্ধতি (Rotation system) বাধ্যতামূলক করতে হবে।
১৪️ নতুন ডিলার নিয়োগে পুরাতন ডিলারদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা যাবে না।
১৫️ ঢাকা রেশনিং অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
১৬️ ডিলার নিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ডিলার প্রতিনিধি ও গ্রাহকদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
১৭️ ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈষম্য দূর করতে হবে।
১৮️ দোকান ও ট্রাক সেল পয়েন্টের জন্য আলাদা ডিলার নিয়োগ দিতে হবে।
১৯️ ৪০৫ জন ডিলারের মধ্যে ২৮৭ জনকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে।
২০️ সব ডিলারকে ঐক্যবদ্ধ থেকে ন্যায্য দাবি আদায়ের আহ্বান জানান বক্তারা।
প্রতিবাদকারীদের পক্ষ থেকে একাধিক আবেদনকারী বলেন, “আমরা কোনো রাজনৈতিক দল নয়— আমরা বঞ্চিত নাগরিক। সরকার ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে কাজ করলে এই অন্যায়ের বিচার হবে।”
তারা অভিযোগ করেন, ঢাকা রেশনিং অফিসের কিছু কর্মকর্তা নিয়মিতভাবে ডিলার নিয়োগে ঘুষ ও বাণিজ্যিক প্রভাব বিস্তার করছেন, যা ওএমএস-এর মূল উদ্দেশ্য—“সুলভ দামে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া”—এই নীতিকে ব্যাহত করছে।
একজন ভুক্তভোগী বলেন, “আমরা চাই না কোনো নিরপরাধ কর্মকর্তা হয়রানির শিকার হন, কিন্তু যারা অনিয়ম করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হোক। রেশনিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া দরকার।”
প্রশাসনের অবস্থান
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা রেশনিং অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে হয়েছে। আবেদনকারীরা অভিযোগ করলে আমরা লিখিতভাবে তদন্ত করব।”
তবে অংশগ্রহণকারীরা দাবি করেছেন, বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং তারা শিগগিরই খাদ্য মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ জানাবেন।
প্রতিবাদী আবেদনকারীরা আশা প্রকাশ করেন, সরকার তাদের দাবিগুলো বিবেচনা করে পুনরায় স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে। তারা বলেন— “ওএমএস প্রকল্পটি জনগণের জন্য, কিছু বিশেষ গোষ্ঠীর নয়। এই অনিয়ম বন্ধ না হলে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো।”