বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যার ইতিহাস গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার এবং ন্যায়ের সংগ্রামে ভরা, ৪৬ বছর পেরিয়ে আজ ৪৭ বছরে পা রেখেছে। এই যাত্রাপথ কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যখনই দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হুমকির মুখে পড়েছে, তখনই বিএনপি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে।
১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনের যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করার লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর মহান স্বাধীনতার ঘোষক ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর ১৯-দফা কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি একটি সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। এই দূরদর্শী নেতৃত্ব খুব দ্রুতই দলটিকে জনগণের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।
জিয়াউর রহমানের আকস্মিক মৃত্যুর পর, তাঁর সহধর্মিণী খালেদা জিয়া গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে দলের হাল ধরেন। তাঁর বলিষ্ঠ ও আপসহীন নেতৃত্বে বিএনপি এক নতুন দিগন্তের সন্ধান পায়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অনবদ্য, যা ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতন ত্বরান্বিত করে। এরপর, ১৯৯১ সালে জনগণের বিপুল ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তরুণদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা এবং দলকে সুসংগঠিত করার মাধ্যমে নতুন গতি এনেছেন। দলের ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তিনি জনগণের অধিকার আদায়, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শুধু বহুদলীয় গণতন্ত্রই প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং মুক্তবাজার অর্থনীতিরও সূচনা করেছিলেন। তিনি আরও জানান যে, বর্তমানে বিএনপি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে দেশকে রক্ষা করতে সক্ষম একমাত্র দল। তাই, সব বাধা মোকাবিলা করে গণতন্ত্র ও মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. মঈন খানও তাঁদের বক্তব্যে শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, বিএনপি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিকে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে হবে। তাদের ৩১-দফা রূপরেখা কথার কথা নয়, বরং কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য দলে গণতন্ত্রের চর্চা এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কাজ করা জরুরি।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি সাত দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। এর মধ্যে রয়েছে দলীয় পতাকা উত্তোলন, জিয়াউর রহমানের মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, বর্ণাঢ্য র্যালি, পোস্টার ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ, এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এই ৪৭ বছরে বিএনপি বহু প্রতিকূলতা পেরিয়েছে। দলটি এখন তার আদর্শ ও অঙ্গীকারের ওপর ভর করে একটি নতুন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে চায়।