বাংলাদেশ সরকার কত হাজার টাকা দৈনিক ট্যাক্স, ভ্যাট, কর পেয়ে থাকে? এবং সেই টাকার সকল বেতন ভাতা দিয়ে প্রতি মাসে যে টাকা বাড়তি থাকে তাতে কি দেশের একটা জেলাকে বিশ্ব মানের জেলায় রূপান্তর সম্ভব কি?
আসুন সম্ভব কিনা তা খতিয়ে দেখি…
এই মুহূর্তে পাওয়া প্রকাশিত তথ্যে “দৈনিক আয় (ট্যাক্স, ভ্যাট, কর)” ও “বেতন-ভাতা বাদে অবশিষ্ট রাজস্ব”–এর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়নি। কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যাসূচক তথ্য দিয়ে একটি আনুমানিক ধারণা তৈরি করা যায়:
প্রাসঙ্গিক তথ্য-
* ২০২৩ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে সরকারের মোট রাজস্ব সংগ্রহ ছিল ৳93,970.9 কোটি ।
* FY2025-26 বাজেটে মোট রাজস্ব আয় হিসেবে ধরা হয়েছে ৳5,64,000 কোটি (যার মধ্যে NBR থেকে আয় ধরা হয়েছে ৳4,99,000 কোটি)
* বেতন ও ভাতার জন্য বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৳82,990 কোটি, যা বাজেটের 10.41%
একটি আনুমানিক হিসাব (বাংলাদেশ টাকায়)
ধরা যাক, রাজস্ব আয় লক্ষ্য থাকবে ৳5,64,000 কোটি/বছর।
এ থেকে বেতন-ভাতা হিসেবে বরাদ্দ করা হবে ৳82,990 কোটি।
বেতন-ভাতা বাদে অবশিষ্ট রাজস্ব = 5,64,000 – 82,990 = ৳4,81,010 কোটি
* বছরে আয় (কর, ভ্যাট, অন্যান্য) প্রায় ৳5,64,000 কোটি
* দৈনিক তাই হতে পারে ≈ ৳5,64,000 কোটি ÷ 365 ≈ ৳1,54,520 লক্ষ (≈ 1,54,520 লক্ষ = 15,45,200 লাখ = 15,452 কোটি টাকার কিছুটা আশেপাশে)
এই হিসাবগুলো কেবল একটি অনুসন্ধানমূলক অনুমান — কারণ বাস্তব রাজস্ব সংগ্রহ কমবেশি হতে পারে, এবং বাজেট বরাদ্দ সবসময় খরচে পরিণত হয় না।
দৈনিক ১৫,৪৫২ কোটি টাকা রাষ্ট্রের আয় থাকলে তা যদি ৩০ দিন গচ্ছিত রেখে প্রতি মাসের টাকা দিয়ে কি দেশের এক একটা জেলাকে বিশ্ব মানের করা যায় না?
১) সোজা গণনা — কত টাকা জমবে মাসে?
আপনি ধরে নিন দৈনিক বাংলাদেশ সরকারের আয় ৳১৫,৪৫২ কোটি টাকা ।
তাহলে ৩০ দিনে জমা হবে:
15,452 কোটি × 30 = 463,560 কোটি টাকা।
এটিকে বড় এককেও বললে ≈ ৪.৬৩৬ ট্রিলিয়ন (ট্রিলিয়ন = ১০০,০০০ কোটি) টাকা।
২) একটি জেলাকে “বিশ্বমানের” করতে মোট কত লাগতে পারে — বাস্তবসম্মত ধারনা-
(নিচের সব সংখ্যাগুলো আনুমানিক; এলাকার আকার, জনসংখ্যা ও প্রয়োজন অনুযায়ী কম-বেশি হবে)
* আধুনিক হাসপাতাল (৫০০-১০০০ বিছানা, সিস্টেম, সরঞ্জাম) : ৫০০ – ১,৫০০ কোটি
* জেলা-স্তরের ইউনিভার্সিটি / টেকনোলজি পার্ক + রিসার্চ কেন্দ্র : ১,০০০ – ৩,০০০ কোটি
* সার্বিক রাস্তা/ব্রিজ উন্নয়ন (স্মার্ট রোড, ড্রেনেজ) : ২,০০০ – ৫,০০০ কোটি
* পানি সরবরাহ + ট্রীটমেন্ট + স্যানিটেশন : ৫০০ – ২,০০০ কোটি
* বিদ্যুৎ গ্রিড আপগ্রেড, রিনিউওেবল সিস্টেম (স্থানীয়ভাবে) : ৫০০ – ২,০০০ কোটি
* আইসিটি/ব্রডব্যান্ড ও স্মার্ট-সিটি অবকাঠামো : ৩০০ – ১,০০০ কোটি
* শিল্প ও এগ্রো-পার্ক (ভিত্তি তৈরি + কোল্ড স্টোরেজ) : ২,০০০ – ১০,০০০ কোটি
* ট্যুরিজম ও সাংস্কৃতিক বেসিক অবকাঠামো : ২০০ – ৮০০ কোটি
* প্রশাসনিক ভবন, পুলিশ ও সিভিল সেবার রিফর্ম ও প্রশিক্ষণ : ২০০ – ৬০০ কোটি
* অপারেশন ও মেইনটেইনন্স রিজার্ভ (বছরের ১/২) : ৫০০ – ২,০০০ কোটি
মোট (ঝুঁকি ও ভ্যারিয়েশনসহ) — প্রায় ১০,০০০ থেকে ৩০,০০০ কোটি টাকা একটি জেলার সার্বিক, উচ্চমানের রূপান্তরের জন্য বাস্তবসম্মত ব্যয় হিসাবে ধরা যেতে পারে। (কোন জেলা-কোন অঞ্চল ভিত্তিক প্রয়োজনে এই পরিসীমা বাড়তে পারে।)
৩) তুলনা ও সিদ্ধান্ত
এরপর মাসিক জমা হিসাব = ৪৬৩,৫৬০ কোটি।
* জরুরি উন্নয়নের আনুমানিক খরচ (এক জেলা) = ১০,০০০–৩০,০০০ কোটি।
তাহলে এক মাসের ওই অর্থই কম-অধিক হিসেবে ৫–৪৬ গুণ পর্যন্ত অনেক বড় উন্নয়ন প্রকল্প কভার করতে পারে। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের রাজস্ব জমা থাকলে মোটামুটি আর্থিকভাবে সম্ভব একটি জেলা দ্রুততম ও ব্যাপকভাবে উন্নত করা — শর্তহীনভাবে ‘অর্থে সক্ষম’ বলা যাবে।
৪) কিন্তু অর্থই হলে কি যথেষ্ট? — নায়কীয় বাস্তবতা ও শর্তগুলো
অর্থ থাকা প্রয়োজনীয়, কিন্তু পর্যাপ্ত নয়। বাস্তবে সফল ‘বিশ্বমানের জেলা’ গড়ার জন্য দরকার:
1. পরিকল্পনা ও প্রকল্প-প্রাধান্য— কী করে টাকা খরচ হবে: ইঞ্জিনিয়ারিং, মাস্টারপ্ল্যান, সময়রেখা।
2. প্রশাসনিক সক্ষমতা ও তাগিদ — দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নযোগ্য এজেন্সি, পারমিট, কনসালট্যান্সি।
3. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা — দুর্নীতি রোধ করতে procurement ও অডিট মেকানিজম।
4. মানবসম্পদ গঠন— প্রকৌশলী, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক, ম্যানেজার নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ।
5. অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট — নির্মাণ খরচের পর দেখা যাবে ধারাবাহিক O&M লাগবে; এটাও বরাদ্দ থাকতে হবে।
6. ক্লাস্টারিং ও PPP — সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (প্রজেক্টগুলোর স্কেল দ্রুত বাড়ানোর জন্য)।
7. সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা — স্থানীয় জনগণকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
8. সমন্বিত আর্থিক প্রবাহ — নগদ একবারে ঢেলে দিলে কার্যকর নয়; পর্যায়ক্রমে টুকরো করে রিলিজ ও মনিটরিং জরুরি।
৫) অবশেষে — সরল উত্তর
অর্থগত দিক থেকে উত্তর হচ্ছে — এমনটি সম্ভব বা হ্যাঁ। দৈনিক ১৫,৪৫২ কোটি টাকার ৩০ দিনের গচ্ছিত অর্থ এক জেলার বিশ্বমানের রূপান্তরের জন্য পর্যাপ্ত (এবং তা অনেক বেশি)। তাই একটা পরিকল্পিত পরিকল্পনা ও সাহসী পদক্ষেপে এমন একটি প্রকল্প হতে পারে বাংলাদেশের জন্য তার নিজের পরিচয় পরিবর্তন আপ্রাণ চেষ্টা। চাই সেখানে যোগ্য নেতৃত্ব এবং নিখুঁত বিন্যাসে মেধাবীদের সমন্বয়।
বাস্তবায়নগতভাবে — শুধুমাত্র টাকা থাকলেই হবে না। পরিকল্পনা-শৃঙ্খলা, সুশাসন, দক্ষ বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া সেই টাকা দ্রুত নষ্ট বা অপচয়ে পরিণত হতে পারে। তবুও চেষ্টা মানুষকে হতাশ করে না।
এবং গবেষণা ভিত্তিক বলা যায়- প্রতিদিন দেশের আয়ের লভ্যাংশ গচ্ছিত রেখে, বছরে ১২ জেলা এবং এমনি করে ৫ বছর ৪ মাসে বিশ্ব মানের ৬৪ জেলাসহ বাংলাদেশ তৈরি করা সম্ভব!