অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন, ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থা,
যা সবার সব বয়সে জ্ঞান অর্জনের পথ উন্মুক্ত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করবে,
এবং অগ্রসর চিন্তা ও মানবিক গুণাবলী সমৃদ্ধ দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরীর মাধ্যমে
ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করতে সহায়তা করবে।
ভূমিকা
একটি রাষ্ট্রে বৈষম্য দুরীকরণের প্রথম ধাপ হচ্ছে সবার জন্য বাধাহীনভাবে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা। এটি একদিকে কর্মক্ষম নাগরিক তৈরীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করে, অন্যদিকে মানবিক গুনাবলী সমৃদ্ধ দায়িত্বশীল ও অগ্রসর চিকার নাগরিক গড়ে তোলার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য এবং সংহতিকে সুসংহত করে।
ইতিপূর্বে ২০১০ সালে গৃহীত শিক্ষানীতি তখনকার বাস্তবতায় অনেক যুগোপযোগী হওয়া সত্ত্বেও বিগত ফ্যাসিবাদি সরকার তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে সেটি বাস্তবায়ন করেনি।
তারা মুখে বৈষম্য দুরীকরনের বাণী উচ্চারণ করলেও বাস্তবে উগ্র জাতীয়তাবাদের রাজনীতি অনুশীলনের মাধ্যমে জাতি বিভক্তিকরণকেই প্রাধান্য দিয়েছে।
ফলে স্বাধীনতার পর থেকেই যেসকল বৈষম্য সমাজে বিদ্যমান ছিল, তার অধিকাংশগুলো বিগত সরকারের ১৭ বছরে প্রকট আকার ধারণ করেছে।
এর ফলে সমাজে তীব্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, যা জাতি গঠন প্রক্রিয়াকে বিনষ্ট করার মাধ্যমে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
এছাড়াও বিগত সরকারের আমলে প্রশ্ন ফাঁস এর মত কেলেংকারী সহ নানা দুর্নীতি ও দলীয়করণের ফলে শিক্ষার মান এর ব্যাপক পতন ঘটে, যার ফলে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকার এর হার উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দেশে তরুণদের মাঝে আত্নহত্যা ও মাদক গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং তাদের বেকারত্বের হতাশাকে পুঁজি করে দেশে মব কালচার দেখা দিয়েছে এবং অসহিষ্ণু বিভক্তির রাজনীতি তার অবস্থান দৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে।
গণসংহতি আন্দোলন বিশ্বাস করে যে, একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের দেশে সামাজিক ও
অর্থনৈতিক বৈষম্য দুর করতে সর্বাধিক গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখবে, এবং আমাদের জাতীয় ঐক্যের মাঝে যে ফাটলগুলো সৃষ্টি হয়েছে তা মেরামত করে ঐক্যবদ্ধ জাতিগঠনে সাহায্য করবে।
মূল লক্ষ্য
আমাদের প্রস্তাবিত শিক্ষা সংষ্কার এর মূল লক্ষ্য গুলো হবে
১) শিক্ষাকে বৈষম্যহীন ও সার্বজনীন করে তোলা
২) শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণ
৩) নাগরিক ও মানবিক গুণাবলী এবং চারিত্রিক গঠন
৪) দেশের বিদ্যমান ও ভবিষ্যত শ্রম ঘাটতি পুরণে কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন
৫) গবেষণাধর্মী উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি তৈরী করে অর্থনৈতিক, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার উন্নয়ন
৬) বয়স্ক শিক্ষা ও অনলাইন শিক্ষার নীতি প্রণয়ন
শিক্ষার বৈষম্য দুরীকরণ
আমাদের শিক্ষা খাতে বৈষম্যের প্রধান কারন সমূহ হচ্ছে দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকা, যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত না হবার ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যহত হওয়া, ও ঝরে পড়া, এবং আবাসন সংকট ও যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত হবার কারণে ভাল শিক্ষক প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকতে না চাওয়া।
এসকল সমস্যা সমাধানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণ অব্যাহত রাখতে হবে এবং নতুন বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে। তবে এই ক্ষেত্রে খেলার মাঠ সহ অন্যান্য অবকাঠামোগত শর্তের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রান্তিক এলাকায় শিক্ষকদের জন্য উন্নত আবাসন এর ব্যবস্থা এবং দুর্গম এলাকায় পুরোপুরি আবাসিক স্কুল নির্মাণ করতে হবে। এর ফলে গ্রামেও ভাল শিক্ষক থাকতে আগ্রহী হবেন এবং শিক্ষার্থী ভর্তির হার বৃদ্ধি পাবে, এবং ঝরে পরার হার
কমে যাবে ।
দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম কে মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনায় তা বিনামূল্যে প্রদান করা হবে, এবং দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা অর্জনকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
বয়স্ক নাগরিকেরা সাধারণ স্কুল এ নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে মানিয়ে নিতে সক্ষম নন। তাছাড়া নিয়মিত শিক্ষার্থীরা শৈশবে ও কৈশোরে যে পদ্ধতিতে শিক্ষা গ্রহণ করেন, তার অধিকাংশই বয়স্কদের উপযোগী নন।
তাই বাংলাদেশের জন্য উপযোগী বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম পদ্ধতি (Adult Learning Method) বাস্তবায়ন করতে হবে।
অন্যদিকে অনলাইন মাধ্যম শিক্ষার জন্য দেশে দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি দূরশিক্ষণ, ঐচ্ছিক শিক্ষা, এমনকি বয়স্ক শিক্ষার জন্য কার্যকরী মাধ্যম হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি অনলাইন ভিত্তিক কোর্স চালু করবে। তবে এসব ক্ষেত্রে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ এর জন্য অনলাইন শিক্ষা নীতিমালা তৈরী করতে হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষা
বর্তমানে আলিয়া মাদ্রাসা বোর্ড ও নিয়মিত শিক্ষা বোর্ড এর কারিকুলাম এর মধ্যে সমন্বয় রয়েছে। ফলে আমাদের এই শিক্ষা সংষ্কার প্রস্তাবনা আলিয়া মাদ্রাসা বোর্ড এর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ এর প্রস্তাব করা হচ্ছে।
কওমি শিক্ষা বোর্ড এর দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমান দেয়া হলেও প্রচলিত ব্যবস্থায় এর সমমান নিশ্চিত করণের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
এই প্ল্যাটফর্ম থেকে গণসংহতি আন্দোলন কওমি ঘরানার সম্মানিত আলেমদের আলোচনার জন্য আহবান জানাচ্ছে। যাতে আমরা বিভিন্ন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যকার সমমান নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিতে পারি, একইসাথে আব্বাসীয় ও আন্দালুসীয় আমলের মাদ্রাসা শিক্ষার মান পুনরুদ্ধার করা যায়।
শিক্ষার মাধ্যমে নাগরিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা
শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত আর্থিক মুক্তি অর্জন হতে পারে না। বরং উন্নত জাতি গঠনের জন্য শিক্ষার্থীদের ন্যায় অন্যায়, সহনশীলতা, অপরের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন, ও পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণ এর অভ্যাস ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষাদান করা হবে।
পাঠ্যপুস্তকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সহ দেশের গণমানুষের অধিকার আদায়ের সকল আন্দোলনে সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সহ অন্য সকল জনগোষ্ঠীর অবদান, এবং দেশের জন্য বিরল সম্মান অর্জনে তাদের কৃতিত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হবে। যাতে করে সব জাতিগোষ্ঠীকে মর্যাদার চোখে দেখতে শেখানো
সম্ভব হয়।
এর ফলে দেশে শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে, দুর্নীতি হ্রাস পাবে, পরিবেশ ও প্রাণ বৈচিত্র রক্ষা পাবে, এবং জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।
প্রদানের সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান ও গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে।
১৩. বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শিক্ষক কর্মচারী সমন্বয়ে বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে ধারা তার বদল ঘটাতে হবে। ছাত্রদের শিক্ষা আবাসন কিংবা শিক্ষকদের নিয়োগ, পদোন্নতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাই যাতে একমাত্র মাপকাঠি হয়, কারো রাজনৈতিক পক্ষপাত যাতে করে বিবেচনার বিষয় না হতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো ও সংস্কৃতি গড়ে তুলতে
হবে।
১৫. শিক্ষা খাতের সাথে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে একীভূত করার চলবে না। এবং এই দুই খাতের বাজেট আলাদাভাবে প্রণয়ন
করতে হবে।
১৬. শিক্ষা খাতের পুনর্গঠনে একটি কমিশন গঠন করতে হবে এবং সেখানে যোগ্য, দক্ষ, অভিজ্ঞ শিক্ষক, চিন্তক ও এ বিষয়ে সক্রিয় নাগরিকদের যুক্ত করতে হবে। এই পুনর্গঠনের জন্য সময় প্রয়োজন এবং তার সাথে সম্পর্কিত ভাবে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষকদের প্রস্তুত করতে হবে। তড়িঘড়ি করে কোন কিছু শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। বিদ্যমান শিক্ষাক্রমে যেসব পরিবর্তন প্রত্যাবশ্যক সেগুলিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কার করে শিক্ষা কার্যক্রমের গতি সচল রাখতে হবে।
১৭. সকলে পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য উচ্চ শিক্ষা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও প্রশিক্ষণের সময়কাল প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়াতে হবে। উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষকদের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের জন্য সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।
পরিশিষ্ট
প্রস্তাবের শুরুতেই বলা হয়েছিল শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু মানুষকে উপার্জনক্ষম করে তোলা নয়, বরং তার মধ্যে মানবিক গুণাবলী বিকাশ ও নাগরিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলাও শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। গণসংহতি আন্দোলন বিশ্বাস করে যে আমাদের এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন হলে আমাদের দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটার পাশাপাশি আমাদের বিভেদ দূর হয়ে ঐক্যবদ্ধ জাতিগঠন প্রক্রিয়ার সূচনা হবে। এবং আমরা অগ্রসর চিন্তার গর্বিত জাতি হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবো।