অনেকেই আছেন যারা গরুর দুধসহ যেকোনো ধরনের দুগ্ধজাত খাবার খেলে হজমজনিত সমস্যায় ভোগেন। এই অবস্থাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় ল্যাকটেজ ইন্টলারেন্স। এটি একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় সমস্যা, যেখানে ক্ষুদ্রান্ত্রে থাকা ল্যাকটেজ এনজাইমটি দুধে থাকা ল্যাকটোজ নামক চিনি ভাঙতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে তৈরি হয় পেটব্যথা, ফোলাভাব, গ্যাস, ডায়রিয়া বা বমিভাবের মতো একাধিক বিরক্তিকর উপসর্গ।
দুধ না খেলে আপাতদৃষ্টিতে সমস্যার সমাধান হয় ঠিকই, কিন্তু এর মাধ্যমে শরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান ক্যালসিয়াম থেকে বঞ্চিত হয়। ক্যালসিয়াম শুধু হাড় ও দাঁতের গঠনেই জরুরি নয়; এটি হৃদযন্ত্র, স্নায়ু এবং পেশির কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই যারা দুধ খেতে পারেন না বা খেতে চান না, তাদের জন্য বিকল্প উৎস থেকে ক্যালসিয়াম গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
ভাগ্যক্রমে, প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে কিছু সবজি ও উদ্ভিজ্জ খাবার রয়েছে যেগুলো দুধের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং অনেক সময় বেশি স্বাস্থ্যসম্মত ও সহজপাচ্য। চলুন জেনে নেওয়া যাক এমন কিছু সবজির কথা, যেগুলো ক্যালসিয়ামের দারুণ উৎস হতে পারে।
১. পালংশাক
সবুজ পাতাযুক্ত সবজিগুলোর মধ্যে পালংশাক অন্যতম। এতে রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ, সি, কে, ফাইবার, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান।
এক কাপ রান্না করা পালংশাকে প্রায় ২৫০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।
এই শাক হাড়ের গঠন মজবুত করতে এবং রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ভিটামিন কে শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে এবং হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমায়।
এছাড়া পালংশাক ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ওজন হ্রাস এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতেও কার্যকর।
২. বাঁধাকপি
বাঁধাকপি এমন একটি সবজি যা ক্যালসিয়ামের চমৎকার উৎস এবং চর্বি ও কোলেস্টেরলমুক্ত। এতে থাকা ফাইবার এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান কোষকে ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করে।
দুই কাপ কাঁচা বাঁধাকপিতে প্রায় ১.৮ গ্রাম ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।
তবে বাঁধাকপিতে থাকে অক্সালেট নামক একটি যৌগ, যা শরীরের ক্যালসিয়াম শোষণে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই বাঁধাকপি ভালোভাবে রান্না করে খাওয়াই ভালো। সালাদ বা ভাজি হিসেবেও এটি খাওয়া যায়।
৩. ফুলকপি
ফুলকপি এবং বাঁধাকপি একই গোত্রের সবজি। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, কে, ফোলেট, ফাইবার এবং ক্যালসিয়াম।
এটি শরীরে ফ্রি র্যাডিকেল নামক ক্ষতিকর জৈব অণুর প্রভাব কমিয়ে ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।
অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফুলকপি শরীরের কোষ গঠন রক্ষা করে এবং পाचनক্রিয়া সহজ করে।
৪. সরষে শাক
সরষে শাক একটি চমৎকার ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার, বিশেষত শীতকালে সহজলভ্য। এতে আছে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স এবং প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন কে।
ভিটামিন কে হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে সাহায্য করে এবং রক্তে ক্যালসিয়াম জমতে সাহায্য করে, ফলে রক্তক্ষরণ প্রতিরোধ হয়।
এক কাপ রান্না করা সরষে শাকে থাকে প্রায় ১.০৩ গ্রাম ক্যালসিয়াম।
৫. মটরশুঁটি
সবুজ মটরশুঁটি ভিটামিন এ, সি, কে, ফাইবার, আয়রন এবং ক্যালসিয়ামের দারুণ উৎস। এটি শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সহায়ক এবং চোখের জন্য উপকারী।
এছাড়া এটি ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং হৃৎপিণ্ড সুস্থ রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৬. চিনা বাদাম ও অন্যান্য বাদাম
চিনা বাদামসহ পেস্তা, আখরোট, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম—সবগুলিই ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস।
বিশেষ করে কাঠবাদাম, যেখানে প্রতি আউন্সে থাকে প্রায় ৭৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম।
এছাড়া বাদামে থাকে ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, পটাসিয়াম, ভিটামিন ই এবং ফোলেট, যা হৃদরোগ ও কোলেস্টেরলের ঝুঁকি কমায়।
৭. ছোট মাছ
যদিও এটি উদ্ভিদজাত নয়, তথাপি নিরামিষভোজী ছাড়া অন্যদের জন্য ক্যালসিয়ামের অন্যতম সেরা উৎস হলো ছোট মাছ।
যেমন: পুঁটি, মলা, কাচকি, ঢেলা, দারকিনা—এগুলোতে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ প্রতি ১০০ গ্রামে ৮.৬ থেকে ১৯০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে।
এছাড়া ছোট মাছ ভিটামিন এ, আয়রন, জিঙ্ক ইত্যাদির চমৎকার উৎস, যা হাড়ের পাশাপাশি চোখ ও রক্তের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে।
কেন দুধ ছাড়া ক্যালসিয়ামের বিকল্প প্রয়োজন?
- ল্যাকটেজ ইন্টলারেন্স রয়েছে এমন মানুষ দুধ খেতে পারলে পেটে গ্যাস, ব্যথা ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
- দুধে থাকা প্রোটিন কিছু মানুষের দুগ্ধ অ্যালার্জির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
- অনেকেই নিরামিষভোজী বা নিরামিষাশী হওয়ার কারণে দুধ খেতে চান না।
- দুধের চেয়ে অনেক সবজি ও বাদাম স্বাস্থ্যসম্মত এবং সহজ হজমযোগ্য।
দৈনিক ক্যালসিয়াম চাহিদা
বয়সভেদে মানুষের ক্যালসিয়ামের চাহিদা ভিন্ন হয়ে থাকে:
- শিশুরা (৪-৮ বছর): ৮০০–১,০০০ মি.গ্রা.
- কিশোর-কিশোরী (৯-১৮ বছর): ১,৩০০ মি.গ্রা.
- প্রাপ্তবয়স্ক (১৯-৫০ বছর): ১,০০০ মি.গ্রা.
- ৫০ বছরের বেশি: ১,২০০–১,৫০০ মি.গ্রা.
উপরে বর্ণিত সবজি ও খাদ্য তালিকা থেকে দৈনিক খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনা গেলে সহজেই এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার দীর্ঘদিন ধরে ক্যালসিয়ামের প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত হলেও, এখন সেই ধারণার পরিবর্তন এসেছে। অনেক মানুষ দুধ হজমে সমস্যায় পড়ায় বা বিভিন্ন কারণে দুধ না খেয়ে বিকল্প উৎস খুঁজে থাকেন। তাদের জন্য উপরে উল্লিখিত সবজি ও বাদাম হতে পারে নিরাপদ ও কার্যকর ক্যালসিয়াম সরবরাহকারী।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পালংশাক, বাঁধাকপি, সরষে শাক, মটরশুঁটি বা বাদাম নিয়মিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করলে শরীর পাবে প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম, তাও আবার প্রাকৃতিক উৎস থেকে। এই বিকল্পগুলো শুধু ক্যালসিয়াম সরবরাহ করে না, বরং শরীরের অন্যান্য পুষ্টির ঘাটতিও পূরণ করে।
সুতরাং, যারা দুধ এড়িয়ে চলেন—তাদের জন্য এই সবজিগুলোই হতে পারে সুস্থ হাড়, দৃঢ় দাঁত এবং শক্তিশালী শরীরের গোপন চাবিকাঠি।