বাংলাদেশের যোগাযোগ খাতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে পদ্মা সেতুতে চালু হচ্ছে আধুনিক নন-স্টপ ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) সিস্টেম।
আজ সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টা থেকে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এই সেবার মাধ্যমে চালকরা গাড়ি থামানো ছাড়াই নির্দিষ্ট লেন ব্যবহার করে টোল পরিশোধ করতে পারবেন। এর ফলে সময় বাঁচবে, যানজট কমবে এবং টোল আদায়ের প্রক্রিয়া হবে আরও স্বয়ংক্রিয় ও আধুনিক।
এর আগে গতকাল (১৪ সেপ্টেম্বর) সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানিয়েছিল। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইটিসি সিস্টেম ব্যবহার করতে হলে গাড়ির মালিক বা ব্যবহারকারীদের প্রথমে ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের ট্যাপ অ্যাপ-এ গিয়ে “ডি-টোল” অপশনে গাড়ি নিবন্ধন ও রিচার্জ সম্পন্ন করতে হবে। এরপর পদ্মা সেতুর আরএফআইডি (RFID) বুথে গিয়ে কেবল প্রথমবারের মতো আরএফআইডি ট্যাগ চেক ও রেজিস্ট্রেশনের কাজ শেষ করতে হবে। এরপর আর পুনরায় কোনো রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট লেন দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল পরিশোধ করে সেতু পার হতে পারবেন।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বিশেষ নির্দেশনায় পদ্মা সেতুতে ইটিসি চালু হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় গাড়ির গতিসীমা ন্যূনতম ৩০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা হতে হবে। নির্দিষ্ট ইটিসি লেনে প্রবেশ করলে ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট থেকে নির্ধারিত টোল স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্তন হয়ে যাবে।
কীভাবে কাজ করবে ইটিসি
ইটিসি সিস্টেমে ব্যবহৃত হবে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (RFID) প্রযুক্তি। প্রতিটি নিবন্ধিত গাড়ির সামনে স্থাপিত ট্যাগের সঙ্গে টোল বুথে স্থাপিত সেন্সরের সংযোগ ঘটবে। গাড়ি টোল লেনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেমটি ব্যবহারকারীর তথ্য শনাক্ত করবে এবং টোল ফি অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে নেবে। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই, ফলে গাড়ি থামাতে হবে না।
এই সিস্টেম চালু হলে পদ্মা সেতুতে টোল বুথে দীর্ঘ লাইনের চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে টোল আদায় হবে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ।
ব্যবহারকারীর জন্য সুবিধা
গাড়ির চালক বা মালিকদের জন্য ইটিসি সিস্টেম সময় ও ঝামেলা কমাবে। নগদ অর্থ বা আলাদা কুপনের ঝামেলায় না গিয়ে অ্যাপের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট রিচার্জ করে নির্দিষ্ট লেন ব্যবহার করা যাবে। একবার নিবন্ধন সম্পন্ন হলে পুনরায় রেজিস্ট্রেশন করতে হবে না। এছাড়া যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহনের জন্যও এই প্রযুক্তি সমানভাবে কার্যকর হবে।
ভবিষ্যতে শুধু ট্রাস্ট ব্যাংকের ট্যাপ অ্যাপ নয়, দেশের অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত অ্যাপের মাধ্যমেও এ সেবা চালু হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের এটুআই ইতোমধ্যে বিভিন্ন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাপকে যুক্ত করার কাজ শুরু করেছে। ফলে আগামীতে বিকাশ, নগদ বা অন্যান্য জনপ্রিয় অ্যাপ ব্যবহার করেও ইটিসি সিস্টেমে টোল পরিশোধ করা সম্ভব হতে পারে।
আধুনিক সেতু ব্যবস্থাপনার নতুন ধাপ
পদ্মা সেতু বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি দেশের অর্থনীতি ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। সেতুর টোল আদায়ে ইটিসি সিস্টেম চালু হওয়ায় এই সেতু ব্যবহার আরও সহজ ও কার্যকর হবে। সেতু কর্তৃপক্ষের মতে, সময় ও খরচ বাঁচানোর পাশাপাশি এটি দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, পরীক্ষামূলক চালুর পর পর্যায়ক্রমে ইটিসি ব্যবহারের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে এবং ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য বড় সেতু ও মহাসড়কেও এ ধরনের সিস্টেম চালু করা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, পদ্মা সেতুতে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেম চালু হওয়া শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, বরং বাংলাদেশকে স্মার্ট অবকাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি বড় পদক্ষেপ। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের পরিবহন খাত আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও নিরাপদ হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।