বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবার—সংগ্রাম, স্বপ্ন আর ছোট ছোট সুখের এক অনন্য সংমিশ্রণ। অল্প আয়ের ভেতরেও যেখানে ভালোবাসা আর উদারতা ছিল সীমাহীন, সেই জীবনের গল্পগুলো আজও হৃদয়ে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
একজন সন্তানের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে তার বাবার কথা—খুবই অল্প বেতনের চাকরি করতেন তিনি। মাস শেষে হাতে আসত মাত্র ৮/৯ হাজার টাকা। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে যেখানে হিসাব করে চলার কথা, সেখানে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। পকেট ছিল ছোট, কিন্তু মনটা ছিল অসীম বড়।
একবার পুরো দুই মাস ধরে বাসা ভরে গিয়েছিল মৌসুমি ফলে—আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, তরমুজ। শুধু বাজার থেকেই নয়, ভালো আম কিনতে তিনি নাকি নিজেই চলে গিয়েছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ল্যাংড়া, গোপালভোগ, রাজভোগ—যত রকম আম আছে, সবই যেন ঘরে তুলেছিলেন। সংসারের হিসাব-নিকাশ ভুলে গিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য।
কিন্তু বাস্তবতা সবসময় আবেগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। একদিন স্ত্রী স্মরণ করিয়ে দিলেন—জমি কেনার জন্য নেওয়া ঋণের টাকা এখনও জমা দেওয়া হয়নি। তখনই যেন আকাশ ভেঙে পড়ল তার মাথায়। ফলের পেছনে খরচ হয়ে গেছে প্রায় সব টাকা। এরপরের পরিস্থিতি ছিল অস্বস্তিকর, কিন্তু সেই ঘটনাও আজ শুধুই স্মৃতি।
বছর পেরিয়ে এখন সেই সন্তানের নিজের সংসার। নিজের সন্তানদের নিয়ে যখন বাজারে যান, তখন সেই পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে। দেশি ফলের প্রতি যে টান ছিল একসময়, তা আজ আর দেখা যায় না নতুন প্রজন্মের মধ্যে। জামকে তারা চিনে “ব্লুবেরি” নামে, ডেউয়া তাদের কাছে অপরিচিত। দেশি ফলের স্বাদ ও আবেগ যেন হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
তার বদলে জায়গা করে নিচ্ছে বিদেশি ফল—স্ট্রবেরি, আপেল, আঙুর। আধুনিকতা আর বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাবে বদলে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস, বদলে যাচ্ছে শিকড়ের সঙ্গে সংযোগও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যবিত্ত পরিবারের এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিকও। একসময় যেখানে সামান্য জিনিসেও ছিল তৃপ্তি, এখন সেখানে চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু কমেছে আবেগের গভীরতা।
এই গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়—এটি বাংলাদেশের অসংখ্য মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিচ্ছবি। যেখানে ভালোবাসা দিয়ে গড়া স্মৃতিগুলো আজও অমলিন, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে সেই সহজ সরল সুখ।
শেষে থেকে যায় একটাই আফসোস—
আমরা কি সত্যিই এগোচ্ছি, নাকি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি আমাদের শিকড়?