বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাধারণ শিক্ষক ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে আজ রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শিক্ষকদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলার প্রতিবাদ জানিয়ে শিক্ষকরা দাবি তুলেছেন- অবিলম্বে অনধিক পাঁচ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করতে হবে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখনও তাদের দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য ক্রমশ বেড়ে চলেছে।
জাতীয়করণের প্রেক্ষাপট
২০১০ সালে দেশে ব্যাপকহারে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় অনেক বিদ্যালয় জাতীয়করণের আওতায় আসলেও, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে যায়। পরে ২০১৩ সালে আবারও জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়া হলেও সেই প্রক্রিয়ায়ও অসংখ্য বিদ্যালয় উপেক্ষিত থাকে।
২০১৫ সালে যখন সারা দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ হাজার, তখনও একটি বড় অংশ জাতীয়করণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে হাজার হাজার শিক্ষক কর্মসংস্থান ও মর্যাদার নিশ্চয়তা হারান।
শিক্ষক ঐক্য পরিষদের নেতাদের ভাষ্যমতে- ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিদ্যালয় শাখা থেকে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়, যেখানে বঞ্চিত বিদ্যালয়গুলোকে নতুন করে যাচাই-বাছাই করে তালিকা প্রেরণের কথা বলা হয়েছিল। ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ সারসংক্ষেপ পাঠানোর নির্দেশ থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সাম্প্রতিক সুপারিশ ও অগ্রগতি
গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পত্র প্রেরণ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি (২০২৫) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কনসালটেশন কমিটি একটি সুপারিশ প্রদান করে। সেই সুপারিশে অনধিক ৫,০০০ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
কিন্তু শিক্ষক নেতাদের দাবি, এই সুপারিশও এখন পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেয়নি। বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও জাতীয়করণ কার্যকর হয়নি। এর ফলে সারা দেশের হাজার হাজার শিক্ষক হতাশা ও ক্ষোভ নিয়ে দিনযাপন করছেন।
শিক্ষক নেতাদের বক্তব্য
সমাবেশে ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মোঃ বরপান আহমেদ বলেন- মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা শিক্ষার উন্নয়নে যে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু কনসালটেশন কমিটির সুপারিশ কার্যকর না হলে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দুঃখ-দুর্দশা দূর হবে না। আমরা আশা করি, সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে।
সংগঠনের আরেক সমন্বয়ক মাহবুবা মাশা বলেন- আমরা বছরের পর বছর ধরে অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করে যাচ্ছি। শিক্ষকরা সামাজিক মর্যাদা হারিয়েছেন, অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছেন। অথচ আমরা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলছি। এই বৈষম্য আমাদের মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
সমন্বয়ক অহিদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন- ২০১৩ সালে সব বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়া হলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কিছু বিদ্যালয়কে বাদ দেওয়া হয়েছিল। সেই বঞ্চনা আজও বহাল আছে। আমাদের দাবি অবিলম্বে পূরণ করতে হবে।
শহিদুল ইসলাম (বগুড়া) বলেন- বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে আমরা কেবল আশ্বাস পেয়েছি। আজও সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন হয়নি। এখন প্রধান উপদেষ্টার কাছে আমাদের শেষ ভরসা।
উপস্থিত অন্যান্য নেতাদের মতামত
নিজাম উদ্দিন বলেন- শিক্ষকদের প্রতি অবিচার দূর করা সরকারের দায়িত্ব। এখনই সিদ্ধান্ত না নিলে আন্দোলন আরও কঠোর হবে।
কামরুন নাহার নুপুর বলেন- শিক্ষকদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে হলে দ্রুত জাতীয়করণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ফরিদুল ইসলাম রতন মনে করেন- জাতীয়করণ শিক্ষকদের আর্থিক সুরক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার মানও উন্নত করবে।
রাদিয়া জাহান বলেন- শিক্ষকরা দেশের আলোকবর্তিকা। তাদের অবহেলা করা মানে প্রজন্মকে অবহেলা করা।
এ ছাড়া মোবারক হোসেন, সেলিম আহমেদ, জহির উদ্দিন, আবদুল মালেক, মশিউর রহমান, হাবিবুর রহমান, উজ্জ্বল, ওমর ফারুকসহ প্রায় শতাধিক শিক্ষক বক্তব্য রাখেন। তারা সবাই দ্রুত জাতীয়করণের দাবি জানান।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতা
শিক্ষকরা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে তারা একাধিকবার আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান, অনশন, কর্মবিরতি ইত্যাদি। প্রতিবারই আশ্বাস দেওয়া হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তাদের দাবি, জাতীয়করণের বিষয়টি দীর্ঘসূত্রতায় ফেলে রাখলে শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ শিক্ষকরা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে পেশায় স্থায়ীভাবে টিকে থাকতে পারছেন না। অনেকেই বাধ্য হয়ে বিকল্প পেশায় চলে যাচ্ছেন।
সরকারের প্রতি আহ্বান
সমাবেশে শিক্ষকরা সরকারের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেনঃ
১. কনসালটেশন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী অনধিক ৫,০০০ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দ্রুত জাতীয়করণ।
২. বঞ্চিত বিদ্যালয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ।
৩. জাতীয়করণ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা।
৪. জাতীয়করণের আগ পর্যন্ত বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা প্রদান।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আজকের এই সমাবেশে অংশগ্রহণকারী শিক্ষকরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তারা আর শুধু আশ্বাসে সন্তুষ্ট নন। তাদের মতে, এই দাবি বাস্তবায়ন ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাধারণ শিক্ষক ঐক্য পরিষদের নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন- যদি দ্রুত জাতীয়করণের পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে তারা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন।