বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে আবারও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন নব্বইয়ের দশকে ঢাকাই সিনেমার এক সময়ের আলোচিত ও দর্শকপ্রিয় নায়িকা শাহিনা শিকদার বনশ্রী (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ভোর ৫টায় মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই অভিনেত্রী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫১ বছর।
অভিনেত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে তার মৃত্যুর খবরটি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করা হয়। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। অবশেষে সব চিকিৎসার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
শুরুটা ছিল রূপালি পর্দায় ঝলমলে আগমন দিয়ে
১৯৭৪ সালের ২৩ আগস্ট মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার মাদবরের চর ইউনিয়নের শিকদারকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শাহিনা শিকদার। পরে ঢাকাই সিনেমার দুনিয়ায় পা রাখেন ‘বনশ্রী’ নামে। ১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সোহরাব-রুস্তুম’ সিনেমার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ঘটে। এই সিনেমায় তিনি জুটি বাঁধেন ঢালিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে।
প্রথম ছবিতেই তিনি দর্শকের নজর কাড়তে সক্ষম হন। ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে তার রসায়ন তখনকার সময়ের সিনেমাপ্রেমীদের হৃদয় জয় করে নেয়। ছবিটি বক্স অফিসে সাফল্য পায় এবং বনশ্রী নামটি তখন নবাগত নায়িকাদের মধ্যে অন্যতম আলোচিত হয়ে ওঠে।
জ্বলে উঠেছিলেন স্বল্প সময়েই
অভিনয় জীবনের শুরুর দিকেই শাহিনা শিকদার বনশ্রী ছিলেন ব্যস্ততম নায়িকাদের একজন। ‘সোহরাব-রুস্তুম’ ছাড়াও তিনি অভিনয় করেছেন ‘মহা ভূমিকম্প’, ‘মৃত্যুর মুখে জীবন’, ‘বিপ্লবের আগুন’, সহ আরও বেশ কিছু ছবিতে।
তার সহ-অভিনেতা হিসেবে পেয়েছেন ঢালিউডের আরেক কিংবদন্তি মান্না, জনপ্রিয় নায়ক আমিন খান, অ্যাকশন হিরো রুবেল-এর মতো অভিনেতাদের। এ সময়টাতে বনশ্রী ঢাকাই চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নিচ্ছিলেন।
তবে নানা কারণে ধীরে ধীরে পর্দা থেকে হারিয়ে যেতে থাকেন তিনি। চলচ্চিত্র জগতের আলো ঝলমলে জীবন থেকে সরে এসে বেছে নেন সাধারণ জীবনযাপন।
আশ্রয়ণ প্রকল্পে জীবনের শেষ অধ্যায়
চলচ্চিত্রে সাফল্যের পর বনশ্রীর ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে কঠিন বাস্তবতা। চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের পর তিনি ঢাকায় বেশ কিছুদিন বসবাস করলেও পরবর্তীতে আর্থিক অনটন ও সামাজিক নানা সমস্যার কারণে ফিরে যান নিজ জন্মস্থান মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায়।
বহু চড়াই-উতরাই পার করে শেষমেশ ঠাঁই হয় সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ছোট ঘরে। সেখানেই বসবাস করছিলেন একমাত্র ছেলে মেহেদী হাসান রোমিওকে নিয়ে। জীবনের শেষ সময়টা তিনি কাটিয়েছেন সাদামাটা এক জীবন নিয়ে- চলচ্চিত্রের আলো ঝলমলে জগৎ থেকে বহু দূরে।
অনেকেই হয়তো জানতেন না যে এক সময়ের এই রূপালি পর্দার নায়িকা জীবনযুদ্ধে কতটা অসহায় ছিলেন। বরাবরই প্রচারবিমুখ ছিলেন বনশ্রী, নিজের কষ্টের কথা মিডিয়ায় তেমন তুলে ধরেননি।
শিল্পাঙ্গনে শোকের ছায়া
শাহিনা শিকদার বনশ্রীর মৃত্যুতে দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যারা নব্বইয়ের দশকের বাংলা সিনেমা দেখেছেন, তাদের কাছে এই অভিনেত্রীর নাম এক চেনা আবেগ। সহকর্মী ও সমসাময়িক অভিনেতারা তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।
ঢাকাই সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন,
“বনশ্রী ছিল অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী একজন শিল্পী। খুব অল্প সময়ে সে দর্শকের মন জয় করতে পেরেছিল। তার চলে যাওয়া আমাদের জন্য কষ্টদায়ক।”
চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির পক্ষ থেকেও বনশ্রীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়েছে। অনেকে বলছেন, এই মৃত্যু আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, চলচ্চিত্রের মানুষদের জন্য একটি সুশৃঙ্খল সহায়তা ব্যবস্থার প্রয়োজন কতটা জরুরি।
একটি নীরব বিদায়
বনশ্রী হয়তো আর কোনো নতুন ছবিতে ফিরবেন না, বড় পর্দায় দেখা যাবে না তার অভিনয়। কিন্তু তিনি থেকে যাবেন তার করা ছবিগুলোর মধ্য দিয়ে। দর্শকদের মনে আজও জায়গা করে আছেন ‘সোহরাব-রুস্তুম’-এর সেই হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত নায়িকা।
তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমরা হারালাম ঢাকাই সিনেমার এক সময়ের উজ্জ্বল এক মুখ, যিনি হয়তো তার প্রাপ্য সম্মান পুরোপুরি পাননি জীবদ্দশায়। তবে সিনেমাপ্রেমীরা তাকে মনে রাখবে—চলচ্চিত্রে তার ছোট সময়ের উপস্থিতি আজও স্মরণীয় করে রেখেছে তাকে।