বাংলাদেশ অসংক্রামক রোগ, পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার কাঠামোর স্বন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে ৭১ শতাংশ মানুষ অসংক্রামক রোগে মারা যাচ্ছে যার ৫১% অকালে মৃত্যুবরণ করছে। ফলে উৎপাদনশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং চিকিৎসা খরচ বেড়ে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পিছিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা দ্রুত “মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা, ২০২৬ “এর খসড়া চুড়ান্ত করার দাবি জানিয়েছে ।
বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস উপলক্ষে আজ ৭ জুন ২০২৬, রবিবার, বিকাল ০৪ টা সেন্টার ফর ল’এন্ড পলিসি এফেয়ার্স (সিএলপিএ ট্রাস্ট) এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্ট এর যৌথ উদ্যোগে অনলাইন জুম প্লাটফর্মে “খাদ্য নিরাপত্তা সবার দায়িত্ব”শীর্ষক ভার্চুয়াল আলোচনা সভা আয়োজন করা হয়। ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট এর স্বাস্থ্য অধিকার বিভাগের কর্মসূচি প্রধান সৈয়দা অনন্যা রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছ বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফর ল’এন্ড পলিসি এফেয়ার্স (সিএলপিএ ট্রাস্ট) সিনিয়র পলিসি এনালিস্ট কামরুন্নিছা মুন্না এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নীতি বিশ্লেষক এডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম। সভায় বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব, ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট এর পরিচালক গাউস পিয়ারী, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন পরিচালক (স্বাস্থ্য বিভাগ) ইকবাল মাসুদ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগ অ্যাসিস্ট্যান্ট সাইন্টিস্ট ডা. আহমাদ খাইরুল আবরার ।
কামরুন্নিছা মুন্না বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা আমাদের অধিকার। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নীতির পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার যেন জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয় এবং ভোক্তা যেন তার খাবার বেছে নিতে পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানভিত্তিক, সহজবোধ্য ও বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং ব্যবস্থা দ্রুত চালু করার আহবান জানান।
মূল প্রবন্ধে এডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি, হাসপাতালের সংখ্যা এবং চিকিৎসা অবকাঠামো বৃদ্ধি করে স্বাস্থ্য খাতে বিরাজমান সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো মোড়কজাত ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ এবং ক্ষতিকর চর্বির উপস্থিতি। এসব উপাদান ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্থূলতা ও কিডনি রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে কিন্তু অধিকাংশ ভোক্তা খাদ্যের মোড়কে থাকা জটিল পুষ্টি তথ্য সহজে বুঝতে পারেন না। এ কারণে ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (Front of Pack Labelling-FOPL)একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। FOPL (ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং) ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করে এবং খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্যের ক্ষতিকর উপাদান কমাতে উৎসাহিত করে। ফলে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি হ্রাস, চিকিৎসা ব্যয় কমানো এবং একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়।
ডা. আহমাদ খাইরুল আবরার বলেন, বাংলাদেশে অসুখের ধরণ ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে হৃদরোগ ও স্ট্রোক, ডায়বেটিক স্থূলতার কারণে বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষ রোগাক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুবরণ করছে । অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোড়কের মধ্যে যে তথ্য দেয়া থাকে তা অস্পষ্ট, ছোট এবং পিছনে এবং নিচের দিকে থাকে। ফলে ভোক্তা পর্যন্ত প্রায় পৌঁছায় না। তথ্যগুলো মোড়কের সামনের অংশে দেয়া উচিত। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ভোক্তাসহ সবার সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।
ইকবাল মাসুদ বলেন, এসডিজির লক্ষ্য অর্জন করতে চাইলে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়ন নয়, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাস্থ্য খাতে কেবল বাজেট বরাদ্দ করাই যথেষ্ট নয় বরং রোগ প্রতিরোধ করা জরুরী। তিনি আরো বলেন, সরকারের নির্বাচনে ইশতেহারেও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে স্থান পেয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে করপোরেট প্রভাবমুক্ত স্বাস্থ্য উন্নয়ন নীতি জরুরি।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, খাদ্যের নিরাপদ মান নিশ্চিত ও ভোক্তাদের সচেতন করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে সহজবোধ্য পুষ্টি লেবেল বা ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (FOPL) ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে যার মাধ্যমে ক্ষতিকর উপাদানের সতর্কতা খুব সহজে জানা যাবে। খাদ্যের সঠিক লেবেল নিশ্চিত করতে “মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা, ২০২৬” খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। এটি দ্রুত চূড়ান্ত করা জরুরী। তিনি খাদ্য নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে সকলকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান।
গাউস পিয়ারী, খাদ্য সুরক্ষা নীতির পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হেলথ প্রমোশন ফাউন্ডেশনের গুরুত্ব এবং দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। নিরাপদ ও স্ব্স্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করা কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়। সরকার, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি সংগঠন, গণমাধ্যমসহ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।